নুসরাত হত্যা : ওসি মোয়াজ্জেম গা ঢাকা দিয়েছেন

0
ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন গা ঢাকা দিয়েছেন। তিনি এখন কোথায় আছেন, সেই তথ্য নেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে।
গতকাল সোমবার ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।
পরোয়ানা জারির পরই তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।
সোনাগাজী থেকে গত ১০ এপ্রিল তাকে প্রত্যাহারের পর রংপুর রেঞ্জে বদলি করা হয়। গত ৮ মে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেন পুলিশ হেড কোয়াটার কর্তৃপক্ষ। এর পরই তিনি অফিস আদেশে পুলিশের রংপুর রেঞ্জ অফিসে যোগ দেন। সবশেষ গত তিন দিন আগেও তাকে রংপুরে দেখা গেছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পেলে তাকে গ্রেফতার করা হবে।
এ বিষয়ে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি অফিসের স্টাফ অফিসার সহকারী পুলিশ সুপার শরিফুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, রংপুরে রেঞ্জে সংযুক্তির আদেশ দেয়ার পর কয়েকদিন আগে মোয়াজ্জেম হোসেন যোগদান করেছেন। এরপর তাকে ঢাকায় পুলিশ সদর দফতরে তলব করায় তিনি ঢাকায় গেছেন বলে শুনেছি। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ হওয়ার বিষয়টি শুনেছি। তবে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আমরা হাতে পাইনি।
রংপুর মহানগর পুলিশের মিডিয়া শাখার মুখপাত্র সহকারী পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন জানান, সোনাগাজীর সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করা সংক্রান্ত কাগজপত্র না পেলে তাদের কিছু করার নেই।
ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন কোথায় জানতে চাইলে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘৮-১০ দিন আগে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন রংপুর রেঞ্জে যোগ দিয়েছেন। নুসরাতের ঘটনায় ঢাকায় গিয়েছেন শুনেছি।’
গ্রেফতারি পরোয়ানার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা জানি না। তবে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পেলে তাকে গ্রেফতারে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এর আগে রোববার তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার তদন্ত শেষে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন পিবিআই সদর দফতরের সিনিয়র এএসপি রিমা সুলতানা। তিনি জানান, তদন্ত শেষে রোববার সাইবার আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
পিবিআই জানায়, গত ১৫ এপ্রিল সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আদালতে মামলা করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় করা অভিযোগটি পিটিশন মামলা হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন আদালত। তদন্তে প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে করা মামলায় যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তার সব কটির সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন পিবিআইপ্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, গত ২৭ মার্চ রাফিকে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন। এমন অভিযোগ উঠলে রাফিকে থানায় ডেকে নেন তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ওসি নিয়ম ভেঙে জেরা করার সময় রাফির বক্তব্য ভিডিও করেন তিনি। এ সময় দুজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে রাফি ছাড়া অন্য কোনো নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না। থানার ওসির সামনে অঝোরে কাঁদছিলেন রাফি।
ওসি যখন ভিডিও করছিলেন, তখন রাফি তার মুখ দুই হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। ওই সময় ওসি আপত্তি করে বলেন, ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও।’ এ সময় তিনি রাফিকে উদ্দেশ করে আরও বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে।’ ভিডিওটি প্রকাশ হলে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা ও তার সহযোগীদের সঙ্গে ওসির সখ্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
ভিডিওতে দেখা গেছে, ওসি মোয়াজ্জেম আপত্তিকর ভাষায় একের পর এক প্রশ্ন করছিলেন রাফিকে। পরবর্তী সময়ে ওসির মোবাইল থেকে ওই ভিডিও ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন রাফিকে হেনস্তা করেও ক্ষান্ত হননি। রাফির গায়ে দুর্বৃত্তরা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনাকে তিনি আত্মহত্যা বলে প্রচার করেছিলেন। এ কাজে এসআই ইকবাল হোসেন ওসিকে সহায়তা করেন। এ ঘটনায় ওসিকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়েছে।
এদিকে রাফি হত্যার ঘটনায় ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলম সরকারেরও গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত কমিটি। তাকেও বদলি করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান রয়েছে।
প্রসঙ্গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। বোরকা পরিহিত কয়েকজন কৌশলে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ রাফি।
এর আগে ২৭ মার্চ রাফিকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পর দিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ পর্যন্ত রাফি হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ২২ জনের মধ্যে সিরাজউদ্দৌলাসহ ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
Share.

About Author

Leave A Reply