ভাত কাব্য

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +
ভাত কম খাবো বলে কত কায়দা যে করি! এক মুঠো ভাতে আট থেকে দশ মুঠো ডাল দিয়ে, সবুজ সবজি ফেলে, ভাত লেই করে যা বানাই তাতে আর ভাতের জাত থাকে না। তা দিয়ে ঘুড়ির সূতোয় মাঞ্জা দেয়া যায়। `ভাত খাওয়া` যায় না। সারাদিন চশমা দিয়ে খুঁজি কোন খাবারে কত কার্বহাইড্রেড (শর্করা) আছে। তারপর তার এক টুকরো নিয়ে সঙ্গে দুনিয়ার শাক পাতা ছাতা-মাথা নিয়ে চিবুই আর চিবুই। ওরা নাকি তখন আমার ব্রেনের সঙ্গে কথা বলে।
ঈশিতা বলেছে, ‘মা অত হুড়াহুড়ি করে খেও না। ব্রেন বেচারাকে জানতে সময় দাও, যে তার দেহ খাচ্ছে। না হলে ঐ অত বেশি খেলেও কাজ হবে না। তোমার খিদে রয়ে যাবে আর তুমি আরো খাবে, আরো ভারী হবে গা। তখন আর পা ফেলতে পারবে না।’
শোনো মা, গরীবের মত ভাত খাবে। কি বলিস পাগল। গরীবরা যা ভাত খায়! একেবারে থালা উঁচু করে। পাশে শুধু লবন, বেগুনী রঙা কাঁচা পেঁয়াজ ও পোড়া মরিচ। না গো মা, তা না গরীব মানুষ যেভাবে ভেবে চিন্তে নিজেদের পয়সা খরচ করে, তুমি করবে ভাত। তোমার ভাত হচ্ছে, তোমার টাকা। এখন সব খেয়ে ফেললে আর কিছু থাকবে না শেষের দিকে।
কিন্তু কে কারে থামায় আর কার মা কে? আমার কুটিমুটি ধানি-মরিচ চোখের আড়াল হলেই লুকিয়ে আরেক মুঠো নিয়ে নি। তরকারি বা মাছ লাগে না। খালি খালি নুন ডলে খেলেও স্বাদ লাগে। শেষের দিকে আব্বার মত একটু ডালে এক মুঠো ভাত নিয়ে লেবু ও কাঁচা মরিচ থেতো করে ভাত কচলে নিয়ে হাপুস হুপুস শব্দ তুলে খেতে হয়। ওটাই সুপার টেস্টি।
বাসী ভাত ভাজির তুলনা নেই। আমরা তখন এই চাইনিজ মাইনিজ চিনতাম না। ফ্রিজ ও ছিলো না। আম্মা আগের দিনের ভাতে একটু কাঁচা মরিচ কুচো, কিমা করে পেঁয়াজ ও সর্ষের তেল দিয়ে ভেজে, নামাবার আগে বাগান থেকে তাজা ধনে পাতা কেটে ফেলে দিয়ে দুবার নাড়া দিয়েই নামিয়ে নিতেন। ভাত বিরান থেকে ধোঁয়া উঠতো। আর শীতের দিনে আমরা চার ভাইবোন পাটিতে বসে হু হা করে সেটা খেতাম। জানালা দিয়ে গায়ে এসে পড়তো পাকা লেবু রং রোদ। আব্বা ইজি চেয়ারে বসে হুক্কায় টান দিতেন। পাশে ‘বেগম’ পত্রিকা। আমাদের খাইয়ে আম্মা পড়বেন।
আমরা কেউ চাইলে আম্মা একটা ডিম নিয়ে গনগনে কাঠের কয়লায় তেল ছাড়াই লোহার কালো কড়াইতে একটি ডিম ঘুটে দিতেন। বহু পরে দেখেছি এ অনেকটা চাইনিজ ফ্রাইড রাইসের মত। ও বলতে ভুলে গেছি, আম্মা ভাত ভাজায় একটু গুঁড়ো ধনে, মরিচও দিতেন।
কদিন ধরে ভাবছি ঈশিতা লন্ডনে আসার আগেই মন প্রাণ ভরে এক দিন এক বাটি পান্তা খেয়েই ফেলি কি বলেন? নিজেই বানাবো। তারপর খেয়ে টেয়ে পেছনের উঠানে ব্যাংককের প্লাস্টিক পাটিতে পড়ে ভাত ঘুম দিয়ে উঠবো। বিলেতের সামার মানে দেশের শীত কাল।
হু, বিলেতেই তা সম্ভব। তবে ব্রিকলেন থেকে রাজা শাইল চাল আনতে হয়। এর গায়ের মধ্যে মধু। অল্প জলের সঙ্গে কচলা কচলি করতে থাকলে গা থেকে ওই মধু নেমে সমস্ত জল ঘোলা করে তোলে। তার সঙ্গে দিতে হবে পোড়া মরিচের ডলা। মাইক্রোওয়েভেই মরিচ রোস্ট করা যায়। খালি একটু কিচেন টাওয়েলে পেঁচিয়ে দেবেন। না হলে কিন্তু বিলেতের বাড়ির কাশি হয়ে যাবে। আরো একটা জিনিস করতে পারেন। পান্তাটা ঘুটে মুটে দলিত করে অনেকটা পাত্রে মরিচ ও কাঁচা পেঁয়াজ কুচোতে দু` চামুচ সর্ষের তেল আর তাজা ধনে পাতা ছিঁড়ে লবন দিয়ে গ্লাভস পড়ে আচ্ছা মত ওদের বাপের দশ ছাড়িয়ে মাখবেন। আর তা দিয়ে রাজা শাইল পান্তা রাজার মত না প্রজার মত হাপুস হুপুস কনুই ডুবিয়ে খাবেন। এমন খাওয়া দেখে পিপীলিকার মনিবও কাঁদিয়া যাবে।
লেখক:  শামীম আজাদ
বিশিষ্ট কবি ও লেখক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী।
Share.

Leave A Reply