কুমিল্লায় প্রেমিককে পরিকল্পিত খুন, আরো এক আসামীকে গ্রেপ্তার, মিলেছে স্বীকারোক্তি

2
(ফলোআপ)

কুমিল্লা প্রতিনিধি।।
কুমিল্লায় প্রেমের কারনে তিন বছর আগে শরীফুল ইসলাম শরীফকে (২২) পরিকল্পিতভাবে খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জামাল হোসেন (৪০) নামে আরো এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কুমিল্লার সদস্যরা।

গ্রেপ্তারকৃত আসামী জামাল ওই খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে কুমিল্লার আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন। সে জেলার নবগঠিত লালমাই উপজেলার উৎসব পদুয়া গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে। খুন হওয়া শরীফ জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার গোলাচৌ গ্রামের সিরাজুল হকের ছেলে।

বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পিবিআই কুমিল্লার পুলিশ পরিদর্শক মো.মতিউর রহমান। এনিয়ে এই পরিকল্পিত এই খুনের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তারা হলেন; খুন হওয়া শরীফের প্রেমিকা উৎসব পদুয়া গ্রামের মোরশেদ আলমের মেয়ে রহিমা আক্তার শিপা এবং তার মামা আবু তাহের।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক মো.মতিউর রহমান বলেন, আমি মামলাটির তদন্তভার পাওয়ার পর রহস্য উৎঘাটনের জন্য পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বিপিএম, পিপিএম এবং পিবিআই কুমিল্লা জেলা ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ওসমান গনি পিপিএম এর নির্দেশনামতে কাজ শুরু করি। এরপর মাত্র ২০ দিনের মধ্যেই এই পরিকল্পিত খুনের নেপথ্যের সব তথ্য বের হয়ে আসে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) উৎসব পদুয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়া জামাল হোসেনকে।

এরপর বুধবার (২০ নভেম্বর) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে সে। জবানবন্দিতে জামাল জানায়- রহিমা আক্তার শিপা আর সে একই বাড়ির বাসিন্দা এবং সম্পর্কে মামা-ভাগ্নি। খুন হওয়া শরীফের সঙ্গে শিপার প্রেমের সর্ম্পকের বিষয়টি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি শিপার মামা আবু তাহের, জামালসহ আরো কয়েকজন। এজন্য তারা (হত্যাকারীরা) শরীফকে শাসন করতে ছেয়েছিলো। এজন্য ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর শিপাকে দিয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শরীফকে ডেকে আনা হয় উৎসব পদুয়া গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেল লাইনের পাশে। প্রেমিকার কথানুযায়ী ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে ওই রেল লাইনে ধারে আসে শরীফ।

এরপর পূর্ব থেকে সেখানো অবস্থান নেওয়া শিপার মামা আবু তাহের, জামালসহ আরো কয়েজন শরীফকে এলোপাতাড়ি পিটাতে শুরু করে। এ সময় শিপা বাড়িতে চলে যায়। পিটুনিতে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তারা (হত্যাকারীরা) শরীফকে ডেমু ট্রেনের নিচে ফেলে দেয়। এর ফলে শরীফের কপালে ও হাতে রক্তাক্ত জখম হয়। এ সময় আসামীরা সবাই মিলে ট্রেনের ধাক্কায় আহত হয়েছে বলে শরীফকে একটি চলমান সিএনজিতে তুলে দেয় হাসপাতালে নেওয়ার জন্য। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

এদিকে, গত ১৫ নভেম্বর (শুক্রবার) কুমিল্লার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে প্রায় একই কথা বলেছে প্রেমিকা রহিমা আক্তার শিপা। তবে জবানবন্দির একটি অংশে শিপা বলে, তার মামারা পিটানোর পর এক পর্যায়ে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে শরীফের কপালে কোপ দেয়। তার ডান হাত ভেঙ্গে দেয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, এই পরিকল্পিত খুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুইজনের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরো বেশ কয়েকজনের নাম এসেছে। আমরা এখন অপর আসামীদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করছি। তবে মামলার তদন্তের স্বার্থে আপাতত অপর আসামীদের নাম আমরা প্রকাশ করছি না।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর রহিমা আক্তার শিপাকে ভালোবাসার কারনে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছিলো শরীফকে। তবে ওইদিন শরীফের লাশ উদ্ধারের পর ট্রেনের ধাক্কায় সে মারা গেছে এমন ধারণা নিয়ে লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। বহু নাটকীয়তার পর ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর কুমিল্লার আদালতে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, এমন অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন সিরাজ। সে সময় আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ফের লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশকে ঘটনাটি তদন্তের নিদের্শনা প্রদান করে। তবে দীর্ঘ তদন্তের পর রেলওয়ে থানা পুলিশ ‘শরীফ ট্রেনের ধাক্কায় দুর্ঘটনায় মারা গেছে’ বলে মামলাটির চুড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে আদালতে।

এরপর পুলিশর প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করলে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কুমিল্লাকে নির্দেশ দেয়। সর্বশেষ মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার মাত্র ২০ দিনের তদন্তে বের হয় ট্রেনের ধাক্কা বা দুর্ঘটনায় নয়, এক মেয়েকে ভালোবাসার কারনে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছিলো শরীফকে।

আরো পড়ুন