এতিমখানার জমিতে বহুতল ভবন: আদালত অবমাননার নোটিশ যাবে কনকর্ডে

অনলাইন ডেক্স।।

83

রাজধানীর আজিমপুরে সলিমুল্লাহ এতিমখানার জমিতে অবৈধভাবে ১৮ তলা ভবন করেছিল আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কনকর্ড। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আইনজীবী মনজিল মোরসেদের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ ভবনটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে, রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এতিমখানা কর্তৃপক্ষকে জমি বা ভবনটি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন আদালত।

রায় ঘোষণা করার পর চলে গেছে প্রায় আড়াই বছর সময়। কিন্তু ভবনটি এতিমখানা কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি আজও। এতিমখানার প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর নির্মাণ করা এত বড় ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কাজে না লাগানোর ফলে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের টাকার আর্থিক অপচয় হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা থাকলে তা দ্রুত নিরসনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট সকলে।

এ বিষয়ে রিটকারী সংগঠনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘কনকর্ডের ওই ভবন এতিমখানার অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হাইকোর্টের দেয়া আদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বহাল রাখেন ২০১৮ সালে। কিন্তু এখনো ভবনটি এতিমখানার কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এতে আদালত অবমাননা হয়েছে। আমরা শিগগিরই আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠাব। এরপরও যদি তারা তাতে সাড়া না দেয়, তাহলে আমরা আদালত অবমাননার মামলা করব।’

অন্যদিকে, কনকর্ডের আইনজীবী আবদুল হান্নান জানান, আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি এখন বিচারাধীন। এ কারণে ভবনটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।

তবে রিভিউর বিষয়ে মনজিল মোরসেদ বলেন, রিভিউ আবেদন করা হলেও ভবন হস্তান্তরে কোনো আইনি বাধা নেই। তাই আমরা আদালত অবমাননার অভিযোগ আনব।

তিনি বলেন, ‘রিভিউ আবেদন করার অর্থ রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত নয়। রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত না থাকায় ওই ভবন হস্তান্তর করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা না করায় রায়ের আদেশ লঙ্ঘিত হয়েছে।’

রিট সূত্রে জানা যায়, ১৯০৯ সালে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ রাজধানীর আজিমপুরে ওই এতিমখানা স্থাপন করেন। পরে আজিমপুর সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা সম্প্রসারণের জন্য সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় জমি ইজারা নিয়ে এতিমখানা পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০০৩ সালের ২২ জুলাই এতিমখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুন্নাহার আহসানউল্লাহ এবং সেক্রেটারি জিএ খান এতিমখানার দুই বিঘা জমি ডেভেলপার কোম্পানি কনকর্ডকে হস্তান্তর করেন। সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশের পর এতিমখানার চার শিক্ষার্থীর পক্ষে ২০১৩ সালে হাইকোর্টে রিট করা হয়। এতে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ পক্ষভুক্ত হয়।

রিটে যুক্তি ছিল, এতিমখানার সম্পত্তি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেয়া হয়েছে। ইজারা চুক্তির শর্ত ছিল, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো কাজে জমি ব্যবহার করা যাবে না। তবে চুক্তির শর্ত ও গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করে ওই সম্পত্তি হস্তান্তর করা হয়।

রিটে আরও বলা হয়, এ সম্পত্তি সরকারের নামে রেকর্ড আছে। তারপরও বেআইনিভাবে এতিমখানার সম্পত্তি কনকর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আবেদনটির প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুল দেয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন।

এতিমখানার সম্পত্তি হস্তান্তর-সম্পর্কিত ওই দলিল এবং ২০০৪ সালের ১৩ এপ্রিলের আমমোক্তারনামা দলিল বাতিল ঘোষণা করে রায়ে বলা হয়, এগুলো শুরু থেকেই অকার্যকর ও বাতিল। রায়ে এতিমখানার জায়গায় কনকর্ডের বানানো ১৮ তলা ভবন এতিমখানার পক্ষে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়। কনকর্ডকে ৩০ দিনের মধ্যে স্থাপনা ও সম্পত্তি এতিমখানাকে বুঝিয়ে দিতে বলা হয়। ব্যর্থতায় সরকারকে সম্পত্তি বুঝে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় এবং এতিমখানার প্রয়োজনে ডেভেলপমেন্ট করার নির্দেশ দেয়া হয়।

এ রায়ের বিরুদ্ধে কনকর্ড কর্তৃপক্ষ আবেদন করলে ২০১৮ সালের ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়টি বহাল রাখেন।

রায় অনুযায়ী অনুলিপি হাতে পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সমাজকল্যাণ সচিবের মাধ্যমে কনকর্ডকে ওই বহুতল ভবন এতিমখানাকে বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর পার হয়েছে আড়াই বছর সময়। কিন্তু ভবনটি এতিমখানার অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়নি।

আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!