ওপারে অপুদা এপারে সাইফুল দা’ অবৈধ পারাপারের নিরাপদ মহেশপুর সীমান্ত

এম এ কবীর, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি।।

5

ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে জেলা প্রশাসনের জরুরী বিধি নিষেধ ও বিজিবির কঠোর নজরদারীর মধ্যেই ব্যাপক হারে মানুষ এপর ওপার করছে। এই অবৈধ পারাপারে দুই দেশের দালালরা রয়েছে তৎপর। বৃহস্পতিবারও ৬জন অনুপ্রবেশকারীকে আটক করে বিজিবি। মহেশপুর উপজেলার জুলুলী ও বৃত্তিপাড়া গ্রাম থেকে তাদের আটক করা হয় বলে মহেশপুর ৫৮ বিজিবির সহকারী পরিচালক নজরুল ইসলাম খান জানান।

এরমধ্যে যশোরের শার্শা উপজেলার সোহেল রানা, ঝিকরগাছা উপজেলার পদ্মপুকুর গ্রামের আলামিন, স্ত্রী রোখসানা বেগম ও মেয়ে হাবিবা খাতুনকে অবৈধ পথে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ও সিরাজগঞ্জের দারিয়াপুর গ্রামের যতিন মদক, স্ত্রী কামনা মদক ও ছেলে লিখন মদককে ভারতে প্রবেশের সময় আটক করে বিজিবি। সীমান্তের বাঘাডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল লতিফ জানান কোন ভাবেই এই জন¯স্রোত থামানো যাচ্ছে না। সন্ধ্যার পর দালালের নিয়োজিত সদস্যরা গ্রামে গ্রামে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা বিজিবির পাহারা ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পারাপারে লিপ্ত হয়।

ঝিনাইদহের মহেশপুরে ভারতীয় সীমান্ত রয়েছে ৭০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁটাতারবিহীন এলাকা প্রায় সাড়ে ১০ কিলোমিটার। এসব এলাকা দিয়ে মুলত অবৈধভাবে যাতায়াত চলে। এদিকে বিজিবির হাতে আটক হওয়ার পরই অনুপ্রবেশকারীরা পাসপোর্ট আইনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। এমন অবৈধ পারাপার করোনার ভারতীয় ধরন ছড়ানোর ক্ষেত্রে ঝিনাইদহ জেলা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে সিভিল সার্জন সেলিনা বেগম জানান।

এ নিয়ে বেশ কয়েকদিন মহেশপুর সীমান্তের বিভিন্ন গ্রামে অনুসন্ধান করে মানুষ পরাপারের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে জানা গেছে, সীমান্তে প্রবেশের সময় কিছু মানুষ আটক হলেও বেশিরভাগ মানুষ ফাঁকফোঁকর দিয়ে চলে যায়। তারা নির্বিঘেœ ওপার ওপার করে বেড়ায়। অন্যদিকে বিজিবির হাতে স্বল্প সংখ্যক অনুপ্রবেশকারী আটক হলেও তাদের ছাড়াতে আদালতপাড়ায় ভিড় করেন দালাল চক্রের সদস্যরা।

আদালতপাড়ায় কথা হয় এমন এক দালাল চক্রের এক সদস্যের সঙ্গে। নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান,‘ভারতে অপু দাদা নামে একজন আছেন। তিনি নদীতে নৌকা চালান। তার সঙ্গে আমাদের কথা হয় হোয়াটসঅ্যাপে। কখনো তাকে দেখিনি। ওপারে তার একটি গোডাউন রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে প্রবেশকারীদের এনে রাখা হয়। বর্ডারে তার লোক আছে। রাতে সুযোগ বুঝে গ্রæপ করে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পাচার করে। এপারে (বাংলাদেশ) সাইফুল দাদা তাদের বুঝে নেন।’

সাইফুল দাদাও একই ভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার করেন। ওই সদস্যের ভাস্যমতে, ‘ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় যারা বিজিবির হাতে আটক হয়, তাদের নাম-ঠিকানা ও আইডিকার্ড অপুদা ভারত থেকে আমাদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেন। আমাদের টাকা পাঠান বিকাশে। এরপর আমরা তাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করি। বাংলাদেশ থেকে সাইফুল দা যাদের পাঠায় ভারতে অপুদা বুঝে নেন। এ কাজে আরো একাধিক চক্র আছে।’ সুবিধা ও পরিস্থিতি বুঝে জনপ্রতি ৫ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।

এভাবেই বছরের পর বছর অবৈধ পথে মহেশপুরের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ-ভারতে শত শত মানুষ আসা যাওয়া করছে। বিজিবির হাতে আটক দালাল মহেশপুরের হাদি বাহিনীর প্রধান হাদিসুর রহমান বলেন, ওপারে যোগাযোগ হয় মেইন মেইন মানুষের সঙ্গে। বেনাপোলের লোক আছে ওদের সঙ্গে। ওপার থেকে গাড়িতে তুলে ফোন দিয়ে বলে দেয়,একটা গাড়ি যাচ্ছে। তাদের অন্য আরেকটা গাড়িতে তুলে দিও।

আমি তাদের অন্য একটা গাড়িতে তুলে দিতাম।’ তিনি বলেন, ‘বেনাপোল থেকে রাজু জহুরুল, ছালাম আর মহেশপুরের কিতাব, আশা, হান্নানসহ আরও অনেকে এই পাচার কাজের সঙ্গে জড়িত। মহেশপুর ভারতীয় সীমান্তের যাদবপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবিএম শাহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ভারত থেকে যে হারে অবৈধ পথে মানুষ আসছে তাতে আমরাই বিপদ ডেকে আনছি। তিনি বলেন, অবৈধ যাতায়াত ঠেকাতে হলে সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয়দের সহযোগিতা খুবই দরকার। মহেশপুরের ৫৮ বিজিবি থেকে পাওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ৮৯৮ জনকে আটক করেছে বিজিবি।

তাদের বিরুদ্ধে সীমান্তবর্তী মহেশপুর থানায় পাসপোর্ট আইনে ১৬০টি মামলা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ১৭৫ জন, ফেব্রæয়ারিতে ২৭০, মার্চে ২২২, এপ্রিল ১০৬, মে মাসে ৫৮ জন ও জুন মাসের ১০ দিনে ৬৭ জন আটক হয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ থেকে বৈধ পথে ভারতে যাওয়া বন্ধ থাকার কারণে অবৈধ পথে যাতায়াত বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে ঝিনাইদহের সীমান্ত এলাকায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডাঃ সেলিনা বেগম জানান,বৃহস্পতিবার ৫৭ জনের নমুনা পরিক্ষা করে ২১ জনের করোনা পজিটিভ হয়েছে। করোনা আক্রান্তের হার বলা যায় উর্ধ্বমুখি।

এর মধ্যে ঝিনাইদহ সদর ৫ জন, শৈলকুপায় ৬ জন, হরিনাকুন্ডুতে ৪ জন, কালীগঞ্জে ৫ জন ও সীমান্তবর্তী উপজেলা মহেশপুরে ১ জন আক্রান্ত হয়েছে। ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মিথিলা ইসলাম বলেন, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে যারা ধরা পড়ছে তাদের আমরা কোয়ারেন্টাইনে রাখছি। যারা ধরা পড়ছে না তাদের ব্যাপারে আরও বেশি তৎপর হাওয়া প্রয়োজন। কারণ এদের মধ্যে যারা করোনা পজিটিভ হবেন, তাদের থেকে ভারতীয় ধরন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন ইতিমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মহেশপুরের সীমান্তবর্তী বাউলি গ্রামে লকডাউন দিয়েছে। সেখানে একই পরিবারে ৬ জন আক্রান্ত হয়েছে।

তাছাড়া জুন মাসের ১০ দিনে জেলায় ১২৫ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন দুই জন। ঝিনাইদহ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া মিলন বলেন, ‘১৯৭৩ সালের পাসপোর্ট অধ্যাদেশ আইনে সীমান্ত অনুপ্রবেশে দুই হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের জেল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুই হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে আদালত থেকে জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সাময়িক ভাবে নিয়ন্ত্রন করা উচিৎ হবে।

তাছাড়া ১৯৭৩ সালের পাসপোর্ট অধ্যাদেশ আইনকেও যুগোপযোগী করা দরকার। কেননা আইনের দুর্বলতার সুযোগে এমন অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটছে বলে তিনি মনে করেন। বিষয়টি নিয়ে ঝিনাইদহের মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে.কর্ণেল কামরুল আহসান বলেন, ‘সীমান্তে বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে। অবৈধ পথে কেউ যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে এজন্য সীমান্তে বসবাসকারীদের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে। তাদের সীমান্ত অতিক্রম না করার জন্য বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তে টহলের জন্য আমাদের দেশের ভেতর কোনো রাস্তা নেই। মাঠ-ঘাট বাগান দিয়ে আমাদের নজরদারি করতে হয়। এছাড়া আমাদের তেমন যানবাহনও নেই। ফলে সাইকেল চালিয়ে মেঠো পথেই আমাদের সদস্যরা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’ ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান বলেন, মহেশপুর সীমান্ত এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মিটিং করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা মিটিং করেছেন এবং সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে মানুষকে আনা নেয়ার কাজে কেউ যেন সহযোগিতা না করে। আমরা এর সুফল পাচ্ছি।

আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!