কাপ্তাই-বিলাইছড়ি-ণ’কাটা মুপ্পোছড়া ভ্রমণ (পর্ব-১.)

লেখকঃ কালিপদ দেবনাথঃ

75

বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের মেলা,হরেক রকম পাগল দিয়া মিলাইছে মেলা!বাদুরতলা আড্ডা খানা শেষ বড়ভ্রমণ দিয়েছিল ২০১৯ টাঙ্গুয়ার হাওর ও ২০২০এ বগালেক ক্রেউকারাডং।একবছরের মাঝে একবার কমলদহ যাওয়া হলো নতুবা বলা চলে ঘরে বসেই কাটিয়ে দেয়া হলো বছর।যারা ঘর ছেড়েছে তাদের আবার আটকে রাখা দায়,আবার অনেকের ঘরে থেকে থেকে ঘরকেই ভালবেসেছে,বের করা দায়।

২০২২জনের বিরাট পাগলের লিস্ট ছিল ট্যুরের, পাগলের দল থেকে মাত্র ১০জন টিকলো।বাকিরা দিব্যি সংসারে বন্দিত্ব বরণ করলো।ধুপ্পানি ঝর্ণা তার ভিডিও দেখে দেখে আমরা ইতিমধ্যে প্রেমে নত,কি অসাধারণ ঝর্ণা।

ভ্রমণ সময় সাধারণত বৃ্হস্পতি থেকে শনি অব্দি হয়, আমরা এইবার একদিন আগেই শুরু করলাম।যাবতীয় হুড়োহুড়ি এড়িয়ে ঘুরতে গেলে প্রকৃতিকে সুন্দরভাবে, নিজের মতো করে উপভোগ করা যায়।বাদুরতলা আড্ডাখানায় আড্ডা শেষে নুরজাহানে চড়ুইপাখীর সংসার দেখেই ভ্রমণ শুরু হয়।

রাতের বেলা লাখলাখ পাখির কিচিরমিচির মনকে শিহরিত করে,কি ভাল্লাগে পাখীদের ডাক।শ্যামলী পরিবহন,আমাদের আসনগুলো সামনের সাড়িতেই পেলাম।চালক টেম্পল রান খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন,সাপের ন্যায় একেঁবেঁকে সব ট্রাকবাস পেছনে ফেলে ভোর হবার আগেই রাঙামাটি জেলায়।

ভোরের অল্প আলোয় পাহাড়ের রুপসুধা অনন্য।যখন কাপ্তাই নামি ঘড়িতে তখন ৫.৩০।প্রাকৃতিক কর্ম সারার জন্যন্য পাবলিক টয়লেট খোঁজ করছি,পেয়েও লাভ হলনা ইহা তালাবদ্ধ।নয়টায় খুলবে,অগত্যা হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা সেরে নিলাম।জেটিঘাট যখন যাই তখন ভোরের লাল সূর্য উঁকি দিল,চিকচিক করছে কাপ্তাইয়ের জলে সূর্য।

দূর পাহাড়ে সাদামেঘের ভেলা,মনে হল সাজেকের চূড়ায় আছি।যাপিতজীবন ইতিমধ্যে শুরু,ডিঙি নৌকা বেয়ে এখান ওখান যাচ্ছে মানুষজন।আমাদের অপেক্ষা করতে হলনা “আবু বকর সিদ্দিক”কে পেয়ে গেলাম।দর কষাকষি করে ওকেই আমরা মাঝি হিসেবে পেলাম,দশম শ্রেণির ছাত্র আবু বকর।

সংসার চালায় নৌকা চালিয়ে, মাস ছয়েক আগে মাকে হারিয়েছে বাবা শয্যাশায়ী।ছোটবোনকে দেখার দায়িত্ব সিদ্দিকে,আদরের বোনকে রেখেই আমাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলো।সকালের সূর্য্যের তেজ তখনো দিতে শুরু করেনি,মৃদু বাতাসে ইঞ্জিনের শব্দে নৌকা চলমান।শান্তির একটা বাতাস আর কাপ্তাইয়ের জল ও দুপাশে গাছগাছালি ঘেরা পাড়া ছেড়ে আমরা যাচ্ছি বিলাইছড়ির দিকে।

সূর্য্যের আলো যত কিরণ দিচ্ছে ততই কাপ্তাইয়ের জল সবুজের মাঝে নীল হচ্ছে।কিছুদূর যেতেই আর্মি ক্যাম্প,সেখানে আইডি কার্ড দিয়ে সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তোলে রাখে।যেকোন বিপদ আপদে উদ্ধার পেতেই ইহা করা হয়।

আবার নৌকা চলছে হাসিতামাশাও চলমান।চলমান বহমান জীবনজীবিকার উদ্দ্যেশ্যে বয়ে যাওয়া মাঝি, মাছ শিকারীর নৌকা।কেউ কেউ বিলাইছড়ি থেকে কাপ্তাই যাচ্ছে,এইখানে তাদের ব্যবসাপাতি।বিলাইছড়ি পৌছার ঠিক আগেও আরেকটা ক্যাম্প,সেখানেও নিয়মনীতি মানতে হলো।দূর থেকে সাদা দালান দেখা যাচ্ছে,ইহাই বিলাইছড়ি হাসপাতাল।

আধুনিক হাসপাতাল বিলাইছড়ির মানুষজন এখন আর কিছু হলেই কাপ্তাই কিংবা রাঙামাটি যেতে হবেনা।আমাদের থাকার জায়গা কোথায় আমরা জানিনা,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জুনায়েত কাউসার ভাইকে ফোন করলাম।জাহাংগিরের রেস্টুরেন্ট, কোথাও খোঁজে পেলাম না।খোঁজে খোঁজে দিশেহারা,উপজেলা পরিষদ ঘুরা সারা।
যেখানে ঘাটে নৌকা বিঁধেছিল সেখানেই আবার আসলাম,সেখানেই আমাদের বাস হবে।

কাউসার ভাই প্রথম ভুল নাম বলেছিলেন,এখন ঠিকটা মনে করে বললেন।বিলাইছড়ির ওসি ইতিমধ্যে নিজামের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছেন,পুলিশ সুপারের অতিথি সবাই।সেনাবাহিনী বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে, আমাদের জন্য নয় রাঙামাটির সাংসদ দীপংকর তালুকদার ও সেখানকার সিও র নিমিত্তে।খুব আহামরি ঘর নয় আবার সেখানকার জন্য আহামরি ঘর।

সারারাত আর সকালে ক্লান্তি দূর হলো সবার স্নান আর প্রাতঃকর্ম সম্পাদনের মধ্য দিয়ে।সিদ্দিক বের হবার তাড়া দিল,তাড়াতাড়ি গেলেই আমরা তাড়াতাড়ি ফিরবো।মুপ্পোছড়া আর ণ’কাটা আজ দেখবো।আবার সেই কাপ্তাইয়ের জলে ভেসে সবুজ প্রকৃতি দেখে যাচ্ছি।সকালের স্নিগ্ধ মৃদু বাতাস এখন আর নেই,এখন চৈত গরম।কাঠফাঁটা রোদে অসহ্য হবার উপক্রম কিন্তু তা ভুলিয়ে দিচ্ছে শরতের অমায়িক সুন্দর নীলাকাশ।ঘন্টাদেড়েক পরই বাঙাল্কাটা,এইখানেই নৌকা নোঙর হবে।

১৪-১৫বয়সী সাদা গেঞ্জি পরিহিত একটা ছেলে নৌকার আগে আগে দৌড়াচ্ছে,নৌকা থামতেই মিষ্টি হাসিতে স্বাগত জানাল।সোলেমান চাকমা-আমাদের এই ঝর্ণাগুলো যাওয়ার সময় গাইড।এইটা একটা পাড়া,নদীর এপাড় ওপাড় দুটোপাড়া।পাড়ায় দোকানপাট বসে, আমাদের পাড়ে একটা দোকানে বসলাম।পাহাড়ী কলা ঝুলছে,ছিঁড়ে মুখে দিতেই অমৃতের স্বাদ পেলাম।

সবাই ইচ্ছেমতো খেয়ে কলার বিল উঠলো ১৫৫টাকা,দশজন বিশালাকার ৩১টা কলা খেলাম।ফরহাদ ভাই একাই ৮টা কলা সাবাড় করলেন,পাহাড়ি ফল সবজি উনার প্রিয়, এতে প্রচুর শক্তি হয়।বিল পরিশোধ করে একটা গরুর দিকে নজর গেল।গরুটার গলায় কাঠের একটা ঘন্টা ঝুলছে।জিজ্ঞ্যেস করে জানা গেল এইটা হলো পালের গরু গুলো হারিয়ে গেলে খোঁজে পাওয়ার উপায়।

হিমেল রসিকতা করে বিশুদার জন্য একটা কিনতে চাইলো,অনেক খোঁজেও বিক্রেতা পেলনা।পাহাড়ের ফাঁক গলে শরতের নীলাকাশ,অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে।পাহাড়ি ধান ক্ষেতের আল ধরে হেঁটে যাচ্ছি।সমান্তরালে মিনিট ত্রিশেক হেঁটে যাচ্ছি।

বুনোফুল গুলোর সুন্দর বিমোহিত করছে,আরো মনকাড়া নানা রঙবেরঙ এর প্রজাপতিগুলোর উড়ে বেড়ানো।একস্থানে বিশটার মতো প্রজাপতি একসাথে সভা করছিল,মানুষের পদচারণায় একসাথে উড়ে দিল ভোঁদৌড়।এইবার ঝিরিপথ। অন্ধকার আর আলোর খেলা।ছোটছোট ক্যাস্কেড থেকে ঝর্ণার প্রবাহিত জলের কলকল শব্দ।যে গ্রুপটাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম তারা ঝর্ণা দেখে ফিরছে,খুব খুশি।উঁচুনিচু পাহাড় বাইতে শুরু করলাম,ঝর্ণা খুব দূরে নয়।

মাঝেমাঝে পাহাড়ে বিশাল পাথরের ফাঁক গলে জলের আনাগোনা।ইতিমধ্যে জোঁক আক্রমণ করে ফেলছে, সবার মধ্যেই কিছুটা আতংক।কামরান জানালো জোঁক কামড়ালে কিছু হয়না,জোঁকের কামড় শরীরের ব্যাথাবেদনা দূর করে।জোঁক ও ঝোপ বুজে কামরানকেই কোপ দিল।কামরান জোঁকের ভয়েভীত,আমরা অট্রহাসিতে বলতে লাগলাম-জোঁক কামড়ালে শরীরের ব্যাথা বেদনা দূর হয়।ওপাশে ণ’কাটা ঝর্ণার শব্দ শোনা যাচ্ছে,আমরা ণ’কাটায় মুপ্পোছড়া থেকে।

আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!