কুমিল্লায় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মসজিদের জায়গা আত্মসাতের অভিযোগ

হালিম সৈকত, কুমিল্লা।।

1,110
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ৭নং নারান্দিয়া ইউনিয়নের আসমানিয়া বাজারের মসজিদের জায়গা সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন সেলিমের নিজ নামে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে বর্তমান কমিটি। অভিযোগে জানা যায় মোয়াজ্জেম হোসেন সেলিম যখন চেয়ারম্যান ছিলেন তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল এবং তিনি বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় চেয়ারম্যান হওয়ায় মসজিদ কমিটির কয়েকজনের স্বাক্ষর নিয়ে মসজিদের নামে ওয়াকফকৃত ১৩ শতক জায়গা তিনি নিজ নামে বিএস খতিয়ানে তুলে নেন।
জানা যায় আসমানিয়া জুমা মসজিদের নামে আবদুল গফুর নামে আসমানিয়া গ্রামের এক ব্যক্তি ১৯৭৭ সালের ১৩ অক্টোবর দলিল নং ৪৬৮৯ মসজিদের নামে ওয়াকফ করে দেন। কিন্তু সেলিম চেয়ারম্যান ক্ষমতার অপব্যবহার করে ১৩ শতক জায়গা নিজ নামে বিএস খতিয়ানে অর্ন্তভূক্ত করে নেন। যদিও জায়গাটিতে বছর খানেক একটি মসজিদ নির্মান করেছে এলাকাবাসি। কিছু দিনের মধ্যেই টিনের মসজিদটি ভেঙ্গে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে বালু, ইট, সিমে, শুরকি, রডসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র রেডি। কয়েক দিনের মধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।
তবে মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গা ব্যক্তি নামে বিএস হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি সংশোধনের জন্য কুমিল্লার বিজ্ঞ যুগ্ম জজ ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতে নারান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আহমেদের ছোট ভাই মো. নাছির উদ্দিন (নুরুউদ্দিন) পিতা মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক সাং খলিলাবাদ পো: নারান্দিয়া উপজেলা তিতাস ও জেলা কুমিল্লা একটি মামলা দায়ের করেছেন। বর্তমানে মামলাটি বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ মোঃ নাসির উদ্দিন বলেন, সেলিম চেয়ারম্যান গায়ের জোরে লোভের বশবর্তী হয়ে মসজিদের জায়গাটি দখল করার পায়তারা করছে। তিনি বিএনপি আমলে ক্ষমতার অপ-ব্যবহার করে জায়গাটি নিজ নামে বিএস পর্চায় নাম তুলে নেন। বর্তমানে বিএস খতিয়ান বাতিলের জন্য আদালতে মামলা চলছে। আমি প্রতিবাদ করায় সেলিম চেয়ারম্যান আক্রোশের বশবর্তী হয়ে আমাকে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে আমার কোন দ্বন্দ্ব নেই। তবে মসজিদের জায়গা ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আমি জিহাদ ঘোষণা করলাম। এটা সবার হক, ফিরিয়ে দিতেই হবে।
মসজিদ কমিটির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, সেলিম চেয়ারম্যান বলছেন মসজিদ কমিটি তাকে জায়গাটি দিয়েছে। তখনকার সময় মসজিদ কমিটির কোন অনুমোদনই ছিল না। তাহলে কি করে তারা স্ট্যাম্প দিল? তাদের তো বৈধতাই নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেলিম চেয়ারম্যানকে রিকোয়েস্ট করেছি যে মসজিদের জায়গা মসজিদের কাছে ফিরিয়ে দিন। আপনাকে আমরা সম্মানিত জায়গায় রাখব। তিনি আমাদের কথায় কোন কর্ণপাত করেন নি।
এই বিষয়ে নারান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মোয়াজ্জেম হোসেন সেলিম চেয়ারম্যানকে অনেক বার নোটিশ দিয়েছি এবং মৌখিকভাবে বলেছি বিষয়টি মিমাংসা করার জন্য কিন্তু আমার নোটিশের কোন তোয়াক্কা করেন নি। যেহেতু মসজিদের জায়গা এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কোন প্রয়োজন আমি মনে করছি না। যতটুকু জানতে পেরেছি উনি মসজিদ উন্নয়নের জন্য সরকারিভাবে চেয়ারম্যানদের জন্য ১% বরাদ্দ থেকে কিছু অর্থ সহায়তা করেছেন। কিন্তু এর জন্য তিনি মসজিদের জায়গা নিতে পারেন না। কারণ এটা আইনত অবৈধ।
আসমানিয়া বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলী আসগর বলেন, সেলিম চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে কোন দলিলপত্র নেই। তিনি কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেন নি। আমরা চাই মসজিদের জায়গা উনি ফিরিয়ে দিক।
ওয়াকফকৃত সম্পত্তি যিনি দান করেছেন তার ছেলে এবং মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমার বাবা মসজিদকে জায়গাটি দান করে গেছেন। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ব্যবহারের জন্য দিয়ে যাননি। আমি চাই আমার বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক। আমার বাবা যে উদ্দেশ্যে জায়গাটি ওয়াকফ করে গিয়েছিলেন সেই উদ্দেশ্যেই জমিটি ব্যবহার হোক।
এই বিষয়ে বিএনপি নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন সেলিম বলেন, আমি ১৯৯৪ সালে চেয়ারম্যান থাকাকালীন মসজিদের মুতোয়াল্লী আঃ রশিদ মেম্বারসহ মসজিদ কমিটি এই ১৩ শতক জায়গা আমার কাছে ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছে। মসজিদের উন্নয়নের স্বার্থে আমি জায়গাটি অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে ক্রয় করেছিলাম এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে ৬০ হাজার টাকা মসজিদে দান করেছিলাম মসজিদের উন্নয়নের জন্য । আমি এই জায়গা ক্রয় সুত্রে মালিক। আমার কাছে দলিলপত্র আছে। এই বিষয়টি নিয়ে যেহেতু আইনী লড়াই চলছে, তাহলে আইনই সিদ্ধান্ত নিবে কে মালিক?
তবে বর্তমান ওয়াকফ আইনে বলা হয়েছে, ওয়াকফের সম্পত্তির আয় থেকে তিনটি উদ্দেশ্যে ব্যয় করা যাবে যথা- ধর্মীয়, দাতব্য ও মানবহিতৈষী কাজে। অন্য কোনো কাজে এ সম্পত্তি হস্তান্তরযোগ্য নয়।
২০১৩ সালের সরকার বিশেষ আইন ওয়াকফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) আইন প্রণয়ন করে। এ আইনের ৩ ধারায় আইনটিকে সব আইনের থেকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের ওয়াকফ আইনের বিধান অনুযায়ী মহামান্য হাইকোর্ট এক রায়ে বলেন কোনভাবেই ওয়াকফকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর করা যাবে না।
আসমানিয়া এলাকাবাসী ও মসজিদ কমিটি তিতাস- হোমনার সংসদ সদস্য সিআইপি সেলিমা আহমেদ মেরী, তিতাস উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ পারভেজ হোসেন সরকার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এবং তিতাস থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে মসজিদের জায়গাটি ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষে সহযোগিতা কামনা করেছেন।
আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!