ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্টির একজন সফল জননী শিলা গোয়ালা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি।।

63

চা শ্রমিকের সন্তান শিলা কুর্মি। গোয়ালা পরিবারে বিয়ে হয়ে পরবর্তি পদবী শিলা গোয়ালা। শৈসবে শিক্ষার সু ব্যবস্থা না থাকা ও পারিবারিক অর্থ সংকটে যার লেখা পড়া হয়নি। কোনদিন স্কুলের বারান্দায়ও যাননি। চরম দারিদ্রতায় যার জীবন অতিবাহিত হয়েছে । তার ৬টি সন্তান যদি বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ে, সু-শিক্ষিত হয়ে কেউ কেউ সরকারী চাকুরী করে, তাহলে এই আলোকিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টীর এক সফল জননীর গল্পটি পড়তে আশারাখছি অনেকের ভালো লাগবে। হয়তো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্টীর জন্য অনুকরনীয়ও হতে পারে।
৫৩ বছর পূর্বে ১৯৬৭ সালে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়নের রাজঘাট চা বাগানে একজন সাধারণ চা শ্রমিকের ঘরে জন্ম গ্রহন করেন শিলা গোয়ালা। তার বাবার নাম জহর লাল কুর্মি ও মায়ের নাম ভগন্তি কুর্মি।

চার বোন ও দুই ভাই এর মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবার টানপুরণের সংসার। মায়ের কাজেই সংসার চলে। মায়ের শরীর খারাপ হলে কাজে যেতে না পারলে হাজিরা নেই। অভাব আরো বেড়ে যায়। ভাতের মার, কচু সেদ্ধ এমন খাবার বহুদিন খেয়েছেন। এক সময় মায়ের অসুন্থতায় মায়ের পরবর্তিতে তিনিই পাতা তুলে দিতেন। বাগানের পরিমিত বয়েসের চেয়ে একটু বেশি বয়েসে তার বিয়ে হয় একই বাগানের শ্রমিক কানাই গোয়ালার সাথে। এটিও টানপুরণের সংসার। বিয়ের কিছুদিন পর কোলজুড়ে আসে সন্তান। দুশ্চিন্তার শেষনেই। সন্তানের ভবিষত নিয়ে অনেকটা মানসিক চাপ অনুভব করেন শিলা গোয়ালা। এ সময় তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খায় নিজে স্কুলের বারান্দায় যেতে পারেননি। একই অবস্থা যদি সন্তানের ভাগ্যেও হয়। এ দুশ্চিন্তায় নিজের পরিবর্তনের জন্য তিনি বিভিন্ন ভাবনা মনে মনে ভাবেন। তিনি তাঁর স্বামীকে প্রস্তাব দেন বাগান থেকে কাজের পরে লাকরী কুটে নিয়ে আসতে যা তিনি বিক্রি করবেন। স্বামী স্ত্রীর পরামস্যে কাজ শেষে লাকরী খুটতেন বাড়িতে এনে তা জমা করতেন। শিলা গোয়ালা এই লাকরীরে সাইজ করে কেটে আটি করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করে স্বামীকে তা বিক্রি করতে পাঠাতেন। অনেক সময় নিজেও বিক্রি করতেন। পাশাপাশি তিনি বাগানের অন্য শ্রমিকের কাছ থেকে ডালপালা ক্রয় করে আবার সাইজ করে কিছুটা লাভে তা বিক্রি করতেন।

তবুও সংসারে টানপুরণ কমে না মেয়ে বড় হচ্ছে। এরই মধ্যে জন্ম হয় তাদের পুত্র সন্তান মিঠু গোয়ালা। শিলার দুশ্চিন্তা আরো বাড়ে। শিলা নতুন করে তার বাড়ির পাশের রাস্তায় শুরু করেন ডিম সিদ্ধ করে বিক্রি করা। আটার গোল্লা বিক্রি করা। এতে কিছুটা বাড়তি আয়ের পথ হয় তার সংসারে। এরই মধ্যে মেয়েকে বাগানের স্কুলে ভর্তি করেন তিনি। শিলার আনন্দের শেষ নেই নিজে স্কুলে যেতে পারেননি কিন্তু মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। বড় মেয়ে লিপিমনি গোয়ালা সেও যেন মায়ের চোখের ভাষা বুঝতে পারে। মেয়ে লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী। যারা কিছুটা লেখা পড়া জানে তাদের সাহায্য নেন শিলা মেয়েকে পড়া দেখিয়ে দেয়ার জন্য। কিছুদিন পর ছেলেরও স্কুলে ভর্তির সময় আসে কিন্তু বিধিবাম ছেলে কিছুটা বাক্ প্রতিবন্ধি। দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে গেলো। স্বামীর দৈনিক হাজিরা মাত্র ২০ টাকা ।

তা দিয়ে কোনবস্থায়ই সংসার চালিয়ে ছেলে মেয়েদের মানুষ করা সম্ভব নয়। কিন্তু পিছু হটবেন না শিলা। এই ছেলেকেও লেখা পড়া করানোর দৃঢ় মানসে তিনি নিজেকে আরো পরিশ্রমি করে তুলেন। ডিম আটার গোল্লা, লাকরী বিক্রির পাশাপাশি তিনি এবার শুরু করের পান দোকানের ব্যবসা। দিনে তিনি দোকানদারী করেন স্বামী বাগানের কাজ থেকে আসার পর বিকেলে থেকে রাতে তাকে সাহায্য করতে শুরু করেন। বাক্ প্রতিবন্দি ছেলেকেও স্কুলে ভর্তি করেন। একে একে তাদের কুলজুড়ে আসে ৬ সন্তান। দুই ছেলে ও ৪ মেয়ে। বেড়ে যায় সংগ্রামী জীবনের প্রাণ চঞ্চলতা। সঞ্চিত অর্থ দিয়ে তিনি একটি গাভী ক্রয় করেন। নিজের যতেœ একটি গাভী থেকে কয়েকটি গাভী হয়। গাভীর দুধ নিয়ে বিক্রি করেন। দুধ থেকে দুই করে বিক্রি করেন। শুধু দুধ দুই নয় দুধের সর থেকে ঘি তৈরী করেও বিক্রি করেন।

এ ভাবেই চলে তার সংগ্রামী জীবন। এদিকে খোলা আকাশের নিচে দোকানদারী করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। এর মধ্যে বাকী পড়ে দেখা দেয় পুঁজি সংকট। কিন্তু হাল ছাড়েনি শিলা। নিজের দুটি কাপর দিয়ে বছর দুই কাটিয়েছেন। সন্তানের মূখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে অনেক দিন তাকে আধপেটা ও পানি খেয়ে রাতে ঘুমাতে হয়েছে। এই অবস্থায় রাজঘাটেই বাড়ির পাশে ছোট একটি ঘর নেন। শুরু করেন চা, পান, সিঙ্গারা বিক্রি। নিজে সেলাই শিখেন। কিন্তু সেলাই মেশিন ক্রয় করতে পারেননি। ছেলে মেয়েরা প্রাইমারী শেষ করে হাই স্কুলে উঠে চাপ বাড়ে। কিন্তু শিলা গোয়ালাও দমে যাওয়ার মহিলা নন। ভোর ৩টায় উঠে দোকানের সিঙ্গারার সবজী কাটাসহ অনান্য কাজ করতেন। গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে দোকানে পুঁজি বাড়ান স্বামী স্ত্রী দুজন মিলে ব্যবসায় আরো মনোযোগী হন। এর আয় দিয়ে সন্ত্রানদের লেখাপড়া চালিয়ে যান। বর্তমানে তার প্রত্যেকটি সন্তানই উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করছ্ েএর মধ্যে তিন জন গ্র্যাজুয়েশন করেছে, তিন জন অনার্স ও ¯œাতক পড়ছে। এভাবে কাঠখর পুড়িয়ে নৃ-জাতিগোিিষ্টর একজন সফল জননী তিনি। তার গল্প এখানেই শেষ নয়।

শিলা গোয়ালার স্বামী কানাই গোয়ালা জানান, তার প্রথম সন্তান জন্মের সময় সাপ্তাহে হাজিরা পেতেন মাত্র ১০০ টাকার মতো। পরবর্তীতে ১৪০ টাকা, পরে ১৬০ টাকা, ২০০ টাকা ৩০০ টাকা ৬০০ টাকা ও বর্তমানে সাপ্তাহে ৭১৪ টাকা হাজিরা (বেতন) পান। সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগার করতে গিয়ে দেবীর ভুমিকা রেখেছেন তার স্ত্রী শিলা গোয়ালা।
অনেক দিন তাদের আদপেটা ( অল্পখাবার) খেতে হয়েছে। নিজের জন্য কখনও ভালো কোন জামা কাপড় কিনতে পারেননি। স্ত্রীকে মনের মতো একটা শাড়ী কিনে দিতে পারেননি।

শিলা গোয়ালা জানান, ছয় সন্তানের মধ্যে বড়মেয়ে লিপি গোয়ালা সিলেট এমসি কলেজ থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে বিএসসি অর্নাস সম্পন্ন করেছেন, ২য় সন্তান জয় গোয়ালা বাক্ প্রতিবন্দি হওয়ার পরও শ্রীমঙ্গল সরকারী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যিমিক পাস করে ¯œাতক তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়েন, ৩য় সন্তান মনি গোয়ালা মৌলভীবাজার সরকারী কলেজ থেকে বাংলায় এম এ করেছেন। ৪র্থ সন্তান রুপু গোয়ালা বি.এস.সি ইন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে (ওটইঅঞ), উত্তরা, ঢাকা থকে অনার্স সম্পন্ন করেছেন। ৫ম সন্তান পিন্টু গোয়ালা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও ৬ষ্ট সন্তান শ্রাবণী গোয়ালা শ্রীমঙ্গল সরকারী কলেজ থেকে এইচ এস সি পাস করে চট্টগ্রামে এশিয়ান ইনবার্সিটি ফর ওমেন্স (অটড) বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ছেন। তিনি জানান, শুধু তার সন্তানকেই লেখাপড়া করানো নয় তার বড় ছেলে জয় গোয়ালা মিঠুকে বিয়ে দিয়ে পুত্রবধু পুস্প গোয়ালাকেও ভর্তি করে দিয়েছেন শ্রীমঙ্গল সরকারী কলেজে।

শিলা গোয়ালার বড় মেয়ে লিপি গোয়ালা সরকারী প্রাইমারী স্কুলে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে তাঁরা সরকারের কাছে দাবী জানান, তাদের বাকী সন্তানরা যেন যোগ্যতানুসারে চাকুরী পায়। শিলা প্রমান করেছেন শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে দারিদ্রতা বা অনান্য সংকট বড় নয় প্রবল ইচ্ছা শক্তিই বড়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাকন লাল কর্মকার জানান, অনেক বৃত্তবান বাড়ির কাছে স্কুল কলেজ রেখেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের একটা দু টা সন্তানকেও উচ্চ শিক্ষিত করতে পারেন না। আর শ্রীমঙ্গল রাজঘাট চা বাগানের পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্টীর অধিবাসী শিলা গোয়ালা বাগানের ভিতরে ছোট একটি ব্যবসা করেই তাদের ৬ সন্তানকে করাচ্ছেন উচ্চ শিক্ষা। এটি চা শ্রমিকদের জন্য অনুকরনীয়।

এ ব্যাপারে রাজঘাট চা বাগানের এক শিক্ষিত যুবক সেলিম হক জানান, শিলা গোয়ালা নিজে লেখাপড়া জানেন না কিন্তু তার প্রত্যেক সন্তানকে শিক্ষিত করেছেন। শুধু সন্তানদের শিক্ষিত করা নয় তিনি বাগানের বিভিন্ন লাইনে লাইনে ঘুড়ে শ্রমিকদের বুঝান তাদের সন্তানদের যেন লেখা পড়া করান। যত কষ্টই হোক কারো সন্তানই যেন লেখা পড়া থেকে বাদ না পড়ে।

এ ব্যাপারে শিলা গোয়ালা আরো জানান, আমার সন্তানকে আমি কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছি । কিন্তু আমি চাই আমার বাগানে সকল শ্রমিকের সন্তানরাই যেন লেখাপড়া করে। তিনি জানান, সময় পেলেই তিনি পাড়ায় বেড়াতে যান এবং নারী শ্রমিকদের একত্র করে তার কষ্টের গল্প বলেন। তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করাতে তার কোন সাহায্যের প্রয়োজন হলে তাকে বলতে। তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন।

আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!