দুইশ টাকায় ২৪ বছর ধরে সেচ সুবিধা দিচ্ছেন দাউদকান্দির মতিন সৈকত

হালিম সৈকত, কুমিল্লা।।

90
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর গ্রামের কৃষকবন্ধু অধ্যাপক মতিন সৈকত। দুইযুগের বেশি সময় ধরে মাত্র ২০০ (দুইশ) টাকা বিঘাপ্রতি মৌসুমব্যাপি বোরোধানে সেচ সুবিধা দিয়ে জাতীয়ভাবে দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছেন। দেশের সব অঞ্চলে বিঘাপ্রতি বোরোধানে মৌসুমে কৃষকদের থেকে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত সেচের খরচ দিতে হয়। ব্যতিক্রম মতিন সৈকত। সব জিনিসের দাম বাড়লেও নানা দূর্যোগে এবং চড়া বাজারেও মতিন সৈকত সেচের টাকার পরিমাণ আগের মতোই মাত্র দুইশ টাকা রেখে চলছেন। যেটি সত্যিই অবিশ্বাস্য।
বিটিভির মাটি মানুষের উপস্থাপক মোঃ রেজাউল করিম সিদ্দিকী মতিন সৈকতকে নিয়ে “মাঠের রাজা’ তথ্য চিত্র নির্মাণ করেন এবং বিটিভেতে কয়েক বার প্রচার করেন। সেখানে তিনি বলেন “কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের আদমপুর গ্রাম। এই গ্রামে একটি অসাধারণ ঘটনা ঘটছে যেটির খবর আমরা অনেকই জানি, অনেকেই জানিনা।
অসাধারণ ঘটনাটি হচ্ছে এই রকম, যে খুব কম মূল্যে সেচ প্রধানের ঘটনা। আমরা জানি যে যখন নীলকররা ছিলো, তখন এক রকমের নির্যাতন ছিলো। যখন কৃষি যন্ত্রপাতি এসেছে তখন আরেক ধরনের নির্যাতন এসেছে। আবার যখন সেচ যন্ত্র এসেছে তখনো কিন্তু আরেক ধরনের নির্যাতন এসেছে কৃষকদের উপর। বলা চলে যে, নীলকরের পরিবর্তে অনেক জায়গায় সেচ কর দিতে হচ্ছে কৃষকদের ফসল ৩ ভাগের ১ ভাগ। বা ৪ ভাগের ১ ভাগ। এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষক ভাইয়েরা ফসলের সেচের খরচ যোগাতে গিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছে। উত্তর বঙ্গে যখন সে রকম ব্যাবস্হা কিংবা দক্ষিণ বঙ্গে একই অবস্থা। তখন যে আদমপুর অন্যরকম ঘটনা। সেখানকার একজন কৃষক। তাকে মানুষজন কৃষক বন্ধু মতিন সৈকত বলেন। তিনি মাত্র ২০০টাকায় সেচ সুবিধা প্রবর্তন করেছেন।”
মিডিয়া ব্যাক্তিত্ত শাইখ সিরাজ মতিন সৈকতকে নিয়ে বিটিভিতে কৃষি- দিবা-নিশি অনুষ্ঠান করেন । সেখানে তিনি বলেন “দর্শক আমি আপনাদের সাথে কথা বলছি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির আদমপুর থেকে। এই গ্রামে নিয়ে আসছি এই কারনে এখানে একটি নদ আছে। মরা নদ কালাডুমুর। দীর্ঘদিন যাবত কোনো খনন নেই। এই কারনে পলি জমতে জমতে এটা ভরাট হয়ে গেছে। স্হানীয় কৃষকরা সংগঠিত হয়ে একজনের নেতৃত্বে তিনি হচ্ছেন মতিন সৈকত নামে স্হানীয় তরুণ কৃষক। তিনি সবাইকে অনুপ্রাণিত করে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে এই কালাডুমুর নদটি খনন করেন। এতে করে গোটা এলাকার কৃষি চিত্র পাল্টে গেছে।
এখন স্হানীয় কৃষকদের যেহেতু পানির প্রাপ্ততা পাচ্ছে, সেচের সুবিধা হচ্ছে। এই কারনে কৃষক ভালো ফলন পাচ্ছে। আর স্হানীয় সৈকতের কথা বললাম, একজন একেকটি এলাকার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটান সেই রকম একজন। যার হাত দিয়ে এলাকার জৈব কৃষি, মাঠ ব্যাবস্হাপনা থেকে শুরু করে কৃষকের নিজস্ব আঙ্গিনায় উঠান বৈঠকের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করা ফুল মৌসুমে, ফলের মৌসুমে তাদেরকে নানাভাবে দিক নির্দেশনা দিয়ে এলাকাটি একশ ভাগ জৈব কৃষি সহ উন্নয়ন এলকায় পরিনত করেছেন।
এটি এন নিউজের “কানেকটিং বাংলাদেশ” অনুষ্ঠানে মুন্নি সাহা বলেন ” আমাদের সঙ্গে আছেন মতিন সৈকত। গত সপ্তাহে যারা দেখেছেন তারা জানেন। এ রকম একজন মানুষ, খুব কম মানুষই আছেন, যাদেরকে নিয়ে খুব বড়াই করতে পারি। গর্ব করতে পারি। মতিন ভাই আমাদেরকে গর্বিত করেন। তিনি একজন সুশিক্ষিত, স্বশিক্ষত, কৃষক, মৎস্য চাষি, অনেক কিছু। রাষ্ট্রপতির পুরষ্কার পেয়েছেন। প্রধানমন্রীর পুরষ্কার পেছেন নানান কিছু নিয়ে। একজন চলন্ত, জীবন্ত উদাহরণ মতিন ভাই আমাদের সঙ্গে আছেন।”
২০১৭ সালের কৃষি মন্ত্রনালয় প্রকাশিত স্বারক গ্রন্হে মতিন সৈকতের সংক্ষিপ্ত জীবনীতে উল্লেখ করা হয়। কৃষি সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে ১৬ জুলাই ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে উপস্থাপন করেন। ” জনাব এম,এ মতিন সৈকতের উদ্ভাবিত স্বল্পমূল্যের সেচ প্রযুক্তি স্হানীয় জনসাধারণকে আকৃষ্ট করেছে। তিনি কৃষি ও মাছ চাষে সেচ ব্যাস্হাপনা এবং পরিবেশ উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছেন।
এছাড়া বোরো মৌসুমে বিঘাপ্রতি মাত্র ২০০ টাকার বিনিময়ে ২০ বছর যাবৎ সেচ সুবিধা প্রধান করে আসছে। নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর বালাইনাশক এবং জমিতে জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনে কৃষককে উৎসাহিত করছেন। তিনি দাউদকান্দি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ১৫৪ টি আইপিএম ও আইসিএম ক্লাবকে সংগঠিত করে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা এবং জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ব করে যাচ্ছেন। “সরেজমিনে আলাপকালে আদমপুরের কৃষক মোঃ বিল্লাল হোসেন (৪০) কালা মিয়া (৯০) মোঃ রোশন আলী (৭৫) মোঃ আলী আশ্রাফ (৫৩) সিংগুলার মোঃ রহিম মোল্লা (৬০) পুটিয়ার মোঃ সুরুজ মিয়া(৫৪) তারা জানান আদমপুর গ্রামের অধ্যাপক মতিন সৈকত ২৫/২৬ বছর ধরে ধান লাগানো থেকে পাকা ধান বাড়ি আনা পর্যন্ত যার যতোবার সেচের পানি লাগে ততোবারই সেচের পানি দিয়ে আসছেন এককালীন মাত্র দুইশ টাকা বিঘাপ্রতি। আমাদের আশেপাশেই হাজার / পনের’শ / দুই হাজার টাকা পর্যন্ত পানি সেচের টাকা দিতে হয়।
এছাড়াও মতিন সৈকত কীটনাশক ব্যবহার বন্ধের জন্য, কালাডুমুর নদী পূনঃখননের জন্য আন্দোলন করছেন। প্রত্যেক বছরই ঢোল পিটিয়ে কৃষককে বলে দেন জমিতে যাতে কীটনাশক ব্যবহার না করে। নিজের হাতে গাছের ডালা কেটে অন্যের জমিনে কানি ক্ষেতে ৫/৬টি ঝাটা-জিংলা পুতে দেন। এতে পাখি বসে পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। আমাদের জমিতে এক সময় বোরোধান ছাড়া কিছুই হতো না। মতিন সৈকতের উদ্যোগে মাঠের জমিতে ২০০০ সালে আর্থ -সামাজিক উন্নয়নে সমবায় ভিত্তিতে আপুসি মৎস্য (২৫০ বিঘা) বিসমিল্লাহ(১০০বিঘা) আপুবি (৪০০বিঘা) তিনটি মৎস্য প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত হয়।
দাউদকান্দি উপজেলা কৃষি অফিসার সারোয়ার জামান বলেন, ‘মতিন সৈকত উপজেলার কৃষকদের খুব আপনজন। সরকারের পাশাপাশি তৃণমূলে কৃষকের পাশে থেকে সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়ান। ২৫ বছর ধরে মাত্র দুইশ টাকায় বিঘাপ্রতি সেচ ব্যবস্থা করে কৃষকদের সেবা দিয়ে আসছেন। তিনি কৃষকদের যেভাবে সংগঠিত করে তাদের সহযোগিতা করছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’’
দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) মোহাম্মদ আলী সুমন বলেন “মতিন সৈকত দাউদকান্দির কৃতী সন্তান হিসেবে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন পত্র পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হাত থেকে দুইবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক গ্রহন করেছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে চারবার চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম স্হান অর্জন করেছেন। আমরা মতিন সৈকতকে নিয়ে গর্ববোধ করি।”
জাতীয় সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অবঃ) মোঃ সুবিদ আলী ভূইয়া লেখেন” মতিন সৈকত কৃষি, পরিবেশ উন্নয়নে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে জাতি গঠনে অবদান রাখছেন”।
উল্লেখ্য, মতিন সৈকত তিন দশকের বেশি সময় বিষমুক্ত ফসল, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, খাল-নদী পূনঃখনন, প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পাখি ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও অবমুক্ত করণ, সবুজায়ন আন্দোলন, মহাসড়কের পাশের এবং শহর নগরের ময়লা আবর্জনাকে থেকে সিটিজেন ফার্টিলাইজার বা নাগরিক সার প্রক্রিয়াকরণ সহ বহুমুখী সামাজিক আন্দোলনে নিরন্তর নেতৃত্ব দিয়ে চলছেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, রেডিও টেলিভিশন তার সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের প্রতিবেদন প্রচার করে তাকে উৎসাহিত করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিবিসি টেলিভিশন তার ডকুমেন্টারি প্রচার করে। জাতি সংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্হা এফ,এ ও, – ডি,এফ,আই,ডি- ইউ এন ভলন্টিয়ার্স এবং কানাডা বাংলাদেশ সেন্টার তাকে অভিনন্দন জানান।
আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!