বঙ্গবন্ধুর বজ্র কণ্ঠের ভাষণই ছিল সিরাজ মিয়ার যুদ্ধে যাওয়ার অদম্য প্রেরণা

লাকসাম প্রতিনিধি

550
সিরাজ মিয়া। ১৯৪৯ সালে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার কালিয়া চৌঁ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আবদুর রহমান ও সূর্যবান নেছা দম্পতির ৫ মেয়ে ও ২ ছেলের সংসারে তিনি ৫ম সন্তান। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা সিরাজ মিয়া শৈশবে কোনো কিছুর অভাব অনুভব করেনি। স্বাচ্ছন্দ্যময় ছিল তার শৈশবের প্রতিটি প্রহর। তবে কৈশোরে পদার্পণ করার পরপরই তাদের পরিবারের ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় বেদনার কালো মেঘ। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি মাকে হারান। ৭ সন্তানের নিরাপদ বেড়ে ওঠা নিশ্চিৎ করতে পুনরায় বিয়ে করেন পিতা আব্দুর রহমান। নতুন মাত্রা যোগ হয় সিরাজ মিয়ার জীবনের গল্পে। সৎ মায়ের সংসারে তিনি এবং তার ৬ ভাই-বোন প্রত্যাশিত আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত হন। ৫ম শ্রেণীর পর আর পড়াশুনার সৌভাগ্য হয়নি তৎকালীন আজগরা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সিরাজ মিয়ার। যার ফলে হৃদয়ে লালিত হাজারো স্বপ্নকে মাটিচাপা দিয়ে তিনি কর্মজীবনে পা বাড়ান।
একদিন ভোরবেলায় সবার দৃষ্টির অগোচরে বাড়ী থেকে বের হয়ে পড়েন সিরাজ মিয়া। রওয়ানা হন অজানা গন্তব্যে। ট্রেনে করে পৌঁছে যান সুদূর দিনাজপুরে। অনভিজ্ঞতা স্বত্তেও জীবন ও জীবিকার তাগিদে মনোনিবেশ করেন অন্যের কৃষিকাজে। আর এভাবেই কেটে যায় তার জীবনের ১যুুগ। এদিকে পরিবারের সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পিতা আব্দুর রহমান এতদিনে তার ১ম সংসারের ছোট ছেলে সিরাজকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে একসময় ভাই-বোনেরাও ভাবতে শুরু করে দেয় তাদের ভাই সিরাজ হয়তো আর কোনদিনই বাড়ি ফিরবেনা।
কর্মস্থলে থাকাকালীন (৭ই মার্চ-৭১) সিরাজ মিয়া স্বাধীন বাংলা বেতারে শুনতে পেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই কালজয়ী ভাষণ। ভাষণের শেষাংশে ‘যার যা আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’ কথাটি চুম্বকের মত আকৃষ্ট করে ২২ বছর বয়সী যুবক সিরাজ মিয়াকে। তখনই মনস্থির করলেন তিনিও যুদ্ধে যাবেন। বঙ্গবন্ধুর বজ্র কণ্ঠের সেই ঐতিহাসিক ভাষণই ছিল সিরাজ মিয়ার যুদ্ধে যাওয়ার অদম্য প্রেরণা। এর কিছুদিন পর (২৬ শে মার্চ) পুনরায় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতারে শুনতে পেলেন স্বাধীনতার ঘোষনা দেওয়ায় রাতের শেষ প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হয়েছেন। যার ফলে ২২ বছর বয়সী যুবক সিরাজ মিয়ার যুদ্ধে যাওয়ার অদম্য স্পৃহা আরো বেড়ে গেল। আর তখন থেকেই তিনিও অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলেন যুদ্ধে যাওয়ার।
অতঃপর আবির্ভূত হলো সেই কাঙ্খিত দিন। সিরাজ মিয়া তার সমবয়সী যুবকদের মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনা দেখতে পেলেন। সবাই যে যার মত যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঘর-বাড়ি ছেড়ে দূরাঞ্চলে ছুটে আসা সিরাজ মিয়া আগে থেকেই যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। তাই আর কালক্ষেপু না করে তিনিও তার এক ঝাঁক সমবয়সী যুবক বন্ধুর সাথে মিলিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৬নং সেক্টর রংপুর-দিনাজপুরের সেক্টর কমান্ডার খাদেমুল বাশার ও সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের নেতৃত্বে পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া উপজেলার ভজনপুরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই সেক্টরের সরাসরি পরিধি ছিল (পশ্চিমে) পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরের বালুরঘাট ও (পূর্বে) আসামের মানিকের চর পর্যন্ত। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের অনেক বীভিষিকাময় স্মৃতিই আজও অক্ষত আছে সিরাজ মিয়ার মানসপটে।
একান্ত সাক্ষাৎকারে একাত্তরের বীরমুক্তিযোদ্ধা সিরাজ মিয়া বলেন, ‘পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গিয়ে আমরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে প্রথমে তারা আমাদেরকে তাদের দলে নিতে চায়নি। কিন্তু পরে আশপাশের এলাকার পথঘাট সম্পর্কে আমাদের সম্যক পরিচিতির কথা জানতে পেরে তারা আমাদেরকে পরীক্ষামূলক ভাবে দলে নিতে সম্মত হয়। একসময় আমরা তাদের কাছে বিশ^স্ত হয়ে উঠি। আর ততদিনে আমাদের যাবতীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণও শেষ হয়। সে সময় একটি বন্দুক এবং একটি বেলচা আমাদের সবার সঙ্গেই বাধ্যতামূলক ভাবে রাখতে হতো। আমরা যখন রাতে ঘুমাতে যেতাম, তখন গর্ত করে তার মধ্যে দুই-তিনজন একসঙ্গেই ঘুমাতাম। আর বাকীরা তাদেরকে পাহারা দিতাম। আবার মাঝে মাঝে ছদ্মবেশ ধারণ করে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে গিয়ে তাদের খবরাখবর জোগাড় করে মুক্তি বাহিনীর কমান্ডারদের কাছেও পৌঁছে দিতাম। আমাদের এ অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হয় ৭১-এর ১৬ এপ্রিল শুক্রবার। পরদিন শনিবার সকালে পাক-বাহিনী সড়কপথ দখল করে নেয়। আমরা তখন তেঁতুলিয়ার মাগুরমারী এলাকায় আশ্রয় নিই। অপরদিকে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিত ভাবে চাওয়াই নদীর ব্রিজ ডিনামাইড দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ায় পাক-সেনারা তেতুলিয়ায় প্রবেশ করতে না পেরে অমরখানায় অবস্থান নেয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় এই তেতুলিয়াই মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আর আমাদের রিক্রুটিং, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রজোগান সহ মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক কর্মকান্ড এখান থেকেই পরিচালিত হতো। পাক-বাহিনী যখন পঞ্চগড় সদর, তালমা, গলেহা, মির্জাপুর, আটোয়ারী সদর, বোদা, ময়দানদীঘি, নয়াদীঘি, সাকোয়া, জগদল, অমরখানাসহ বেশ কয়েকটি স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে। আমরা তখন তেতুলিয়া, চাউলহাটি, কোটগাছ, থুকরাবাড়ি, ভজনপুর, মাগুরমারী, ময়নাগুড়ি, দেবনগর ও ব্রাহ্মণপাড়ায় অবস্থান নিই। ২৯ নভেম্বর সোমবার পঞ্চগড় হানাদারমুক্ত হয়। আমরা পাক-হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে পঞ্চগড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দিই। তবে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কেউই অস্ত্র ছাড়িনি।’
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ২২ বছরের যুবক সিরাজ মিয়ার সম্যক পারদর্শিতায় মুগ্ধ হন কমান্ডাররা। যার ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতা কম হওয়া স্বত্তেও যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তারা তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে নিয়োগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের ১ বছর পর বাড়িতে আসেন সিরাজ মিয়া। এক যুগ পর আদরের ছেলেকে ফিরে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হন পিতা আবদুর রহমান। এর ঠিক কয়েকবছর পরই ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করেন পাশ^বর্তী চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ছোটখিল গ্রামের আবদুল গফুরের মেয়ে আলেয়া বেগমের সাথে। দাম্পত্য জীবনে তিনি ২ ছেলে ও ৪ মেয়ের জনক। তার বড় ছেলে মোজাম্মেল হক আলম বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশায় সম্পৃক্ত এবং ছোট ছেলে একরামুল হক সবুজ একজন স্বনির্ভর ব্যবসায়ী। সাধ্যানুযায়ী পড়াশুনা করিয়ে বড় দু’মেয়েকে সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে দিয়েছেন। আর এখনো সেঝো এবং ছোট মেয়ের পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৫ বছর যথাযথ ভাবে সৈনিকের দায়িত্ব পালন করার পর তিনি ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি পরিবার-পরিজনের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাচ্ছেন তার সংগ্রামী জীবনের ‘বার্ধক্য’ অধ্যায়।
বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ মিয়া বলেন, ‘সরকার আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কাজ করছে। আমাদেরকে যথাযথ ভাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও রেশন না দিলে, হয়তো আমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের সন্তানদেরকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারতাম না।
আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!