বহিষ্কৃত যুব মহিলা লীগ নেত্রীর ‘পাপনামা’

নাজমুল হুদা সাভার।।

100
সম্প্রতি বহিষ্কৃত যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়া কান্ডে যখন টক অব দ্যা কান্ট্রি। তখন আশুলিয়ায় বহিষ্কৃত এক যুব মহিলা লীগ নেত্রীর নানা অপকর্ম টক অব দ্যা আশুলিয়া। সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানা যুব লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী মনিকা হাসানের নানা অপকর্ম নিয়ে আলোচনা এখানকার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গণে। মাদক ও নারী ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখল ছাড়াও মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলায় অনেককেই ফাঁসিয়ে ব্যালকমেইলের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
ভারী মেকাপ আর চোখ ধাঁধানো সাজ যেন এই নেত্রীর সম্বল। নিজেকে পরিচয় দেন কেন্দ্রীয় মহিলা যুবলীগের কার্য্য নির্বাহী সদস্য বলে। যদিও কেন্দ্রীয় কমিটিতে মনিকার কোন সদস্য পদ নেই বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির শীর্ষ এক নেত্রী। এছাড়া স্থানীয় নেতা ও যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী সহ হাই প্রোফাইল ব্যক্তির সাথে সখ্যতার কারণে প্রভাব বিস্তার করেছেন নিজ এলাকায়। বেপড়োয়া মনিকা যেন হয়ে উঠেছেন আশুলিয়ার ‘পাপিয়া’, এমন গুঞ্জন এখন সর্বত্র। তাহলে মাদক ও দেহ ব্যবসার অভিযোগে বহিষ্কৃত নেত্রী মনিকা কিভাবে এসব অপকর্ম চালাচ্ছেন এমন প্রশ্ন সবার।
মাদক দ্রব্য অধিদপ্তরের অভিযোগ পত্র সূত্রে জানা যায়, আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী মনিকা হাসান ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্য মাদক এবং দেহ ব্যবসার সাথে জড়িত। এমনকি মনিকা তার নিজ বাড়িতেই এসব অনৈতিক কাজ পরিচালনা করেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘মনিকা হাসান ইয়াবার ডিলার, তার দুলাভাই আফজাল হোসেন এবং মামাত ভাই জাহিদ ইয়াবা ও ফেন্সিডিল ব্যবসায়ী। এছাড়া মনিকার বড় খালা আয়শা বেগম, খালু রনি ও খালাতো বোন নার্গিস ইয়াবা ব্যবসায়ী।’
শুধু মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরই নয়; মনিকার মামা কাজল মিয়া, মামী নাজমুন নাহার, খালু শহীদ ভ ইয়া, বোনজামাই জসিম উদ্দিন ও খালাত ভাই রাজু মিয়ার নামেও আশুলিয়া থানায় রয়েছে আরো চারটি মাদক মামলা।
অভিযোগ রয়েছে, মনিকা হাসান মাদক দ্রব্য অধিদপ্তরের তালিকা ভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী চিহ্নিত হওয়ার পর নিজেকে নির্দোষ দাবী করে তার এলাকার ধামসোনা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার মঈনুল ইসলামের নিকট মিথ্যা প্রত্যয়ন পত্র চান। কিন্তু এতে রাজি না দেওয়ায় পরবর্তীতে ওই ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাতে থাকে মনিকা। পরে বিপাকে পড়ে ওই ইউপি মেম্বার থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
এছাড়া আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমুন নাহার কাজল ও সাধারণ সম্পাদক সাবিনা আক্তার লাভলী অপপ্রচার, হয়রানি ও হুমকি প্রদানের অভিযোগ এনে মনিকার বিরুদ্ধে থানায় ডায়েরি করেন। এমনকি ৩ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগে বহিষ্কৃত যুবলীগ নেত্রী মনিকার বিরুদ্ধে ঢাকার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে একটি মামলা চলমান রয়েছে।
আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমুন নাহার কাজল অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মনিকাকে বহিষ্কার করা হলে সে আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে আমার স্কুল পড়–য়া ছেলেকে মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠায়।
আশুলিয়ার পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার আজাদ নামে এক ব্যক্তি জানান, ‘মনিকা নামে ওই যুবলীগ নেত্রী এক নারীকে দিয়ে মিথ্যা ধর্ষণ মামলার মাধ্যমে তাকে ব্যালকমেইল করেছে।’
এদিকে আশুলিয়ার দক্ষিণ বাইপাইল এলাকার আব্দুল মজিদের মেয়ে যুবলীগ নেত্রী বেপড়োয়া মনিকা হাসানের নানা অসামাজিক কর্মকান্ডে ভীতসন্ত্রস্থ ও অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। কিন্তু মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসার ভয়ে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চায় না এই এলাকার কেউই।
এসব অস্বীকার করে মনিকা হাসান বলেন, ‘২০১৭ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি মহিলা যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্য্য নির্বাহী সদস্য হয়েছেন। তার ও পরিবারের বিরুদ্ধে আনা মাদক সহ অন্যান্য অভিযোগ মিথ্যা। একটি রাজনৈতিক মহল উদ্দেশ্য মূলক ভাবে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।’
ঢাকা জেলা মহিলা যুবলীগের আহ্বায়ক শিলারা ইসলাম জানান, ‘গত এক বছর আগে মনিকা আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক থাকাকালীন তাকে চিনতাম। পরে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। এখন তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাই ব্যবস্থা নেবেন।’
সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা দৌলা বলেন, ‘মনিকার বিষয়ে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে অভিযোগ জানানো হবে। তারাই তদন্ত করে এ বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবেন।’
তবে মনিকার সাথে ঘনিষ্ঠ ছবির প্রসঙ্গে ঢাকা-১৪ আসনের সাবেক এমপি সাবরিনা আক্তার তুহিন বলেন, ‘আমার সাথে পাপিয়া ও আশুলিয়ার মনিকার কোন সখ্যতা নেই। তবে মনিকার বিরুদ্ধে মাদকের অভিযোগ থাকলে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন তিনি।’
এব্যাপারে মহিলা যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল এমপি জানান, ‘যুব মহিলা লীগের অনেক নেত্রী কিংবা তাদের সাথে অনেক মেয়েই এসে আমার গলা ধরে ছবি তোলে। এতে আমি কি করবো? তবে এখন থেকে সতর্ক হয়েছি। কাউকে না চিনলে এখন আর ছবি তুলবো না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আশুলিয়ার মনিকা হাসান নামে ওই নারী যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নয়। যদি সে এই পরিচয় দিয়ে অপকর্ম করে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এব্যাপারে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আশুলিয়ার যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত ওই নেত্রীর বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া চাঁদাবাজি, দখল ও মিথ্যা মামলা দিয়ে ব্যালকমেইলের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে আমরা এ বিষয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
আরো পড়ুনঃ