ভার্চুয়াল নয়, নিয়মিত আদালতের দাবি আইনজীবী সমাজের

সাইফুল ইসলাম।।

238

মহামারি করোনা পরিস্থিতির মাঝে অন্যান্য দপ্তর গুলো যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে তাহলে আদালত কেন নয়? সংকটকালীন এ মুহূর্তে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া আইন পেশায় নিয়োজিত মানুষদের জীবন জীবিকা রক্ষায় ভার্চুয়াল নয় নিয়মিত আদালত খুলে দেওয়ার দাবি আইনজীবীদের।

২ জুলাই বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় অনলাইন নিউজ পোর্টাল অন নিউজ২৪ এর ফেসবুক পেইজের সাপ্তাহিক লাইভ আয়োজন ‘টক অন’ অন নিউজ ২৪ শীর্ষক অনুষ্ঠানের ৫ম পর্বে এসব কথা বলেন বক্তারা। সাংবাদিক মানিক শিকদারের সঞ্চালনায় লাইভ অনুষ্ঠানটির আলোচনার বিষয় ছিলো “করোনায় ভার্চুয়াল আদালত”।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবি এডভোকেট একলাছ উদ্দিন ভূইয়া, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিউমেন রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ। কুমিল্লা জজকোর্টের আইনজীবি এডভোকেট নুরুর রহমান, সাবেক সাধারন সম্পাদক জেলা আইনজীবী সমিতি কুমিল্লা। সিলেট জজকোর্টের এডভোকেট দেওয়ান তালহা কিবরিয়া, যুগ্ম সম্পাদক বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন যুক্তরাজ্য।

২৬শে মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষনার পর গত ৯ই মে ভার্চুয়াল আদালতের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরপর থেকে দেশের আদালতসমূহে ভার্চুয়াল জামিন শুনানির কার্যক্রম শুরূ হয়। আদালত ব্যবস্থার ভার্চুয়াল কার্যক্রম নিয়ে দেশের আইনজীবীদের মাঝে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

অনুষ্ঠানে এডভোকেট একলাছ উদ্দিন ভ’ইয়া বলেন, ভার্চুয়াল আদালত বিচার ব্যবস্থার একটি আধুনিক ভালো উপায় হলেও নেটওয়ার্ক সমস্যা, লিঙ্ক পেতে দেরি হওয়া এবং প্রযুক্তির পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় অভিজ্ঞতার অভাবে প্রবীন আইনজীবিরা ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থায় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ভার্চুয়াল আদালতে শুধুমাত্র অস্থায়ী জামিন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এতে আসামীদের জামিন ছাড়া অন্য কার্যক্রম করা যাচ্ছেনা। তাই আসামীদের আত্মসর্মপন ও অন্যান্য কার্যক্রম আটকে আছে।

এডভোকেট নুরুর রহমান বলেন, ২৬শে মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষনার পর আদালতসমূহ বন্ধ হয়ে যায়। আদালতসমূহ বন্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে স্বশরীরে উপস্থিতি মেনে এটিকে আইনের আওতায় এনে ৯ই মে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ অনুমোদন করেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। এরপর ১০ ই মে গেজেট প্রকাশিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে ১১ ই মে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ভার্চুয়াল আদালত কার্যক্রম শুরু হয়। ঐতিহাসিক এ দিনে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ কর্তৃক একজনকে জামিন দেওয়া হয়। এটিই ছিলো দেশের ইতিহাসে ভার্চুয়াল আদালতের প্রথম জামিন।

তিনি একটি পরিসংখ্যানের বিবৃতি দিয়ে বলেন, ৩০ মে পর্যন্ত আদালতের কার্যদিবসকালে লঘু অপরাধে আটকাপড়া প্রায় ২০সহস্রাধিক মানুষ জামিন পায়। ভার্চুয়াল আদালত ব্যাবস্থা দেশের আইনজীবিদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন, আইনজীবিদের মাঝে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে তার কারন আমাদের দেশে প্রায় ৬০ হাজার আইনজীবিদের মাঝে অনেকেরই ভার্চুয়াল আদালতের প্রয়োজনীয় উপকরনসমূহের সাথে পরিচিতি নেই। ফলে এ প্রজন্মের তরুন আইনজীবিরা বিষয়টির সাথে নিজেদের দ্রুত মানিয়ে নিতে পারলেও প্রবীন আইনজীবিরা তা পারছেনা।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাড়া বাংলাদেশের ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনায় যে অ্যাপটি ব্যাবহারের কথা ছিলো এটি ব্যবহার করতে প্রত্যেক আইনজীবিকে নতুন একাউন্ট খুলতে হতো। তারপর মামলার ফাইলসমুহ সেখানে স্কেন করে আপলোড করতে হতো। কিন্তু ব্যাবহার শুরুর কয়েকদিন পর থেকেই অ্যাপটিতে আর মামলার ই-ফাইল আপলোড করা যায়নি। ফলে ই-মেইলে আবেদন পাঠাতে হতো আর বিভিন্ন আদালত সমুহ ভিন্ন ভিন্ন অ্যাপ ব্যাবহারের মাধ্যমে শুনানি কার্যক্রম সম্পন্ন করতো। আইনজীবি সমাজের জন্য কোন সরকারি প্রনোদনা না থাকায় সংকটকালীন এ সময়ে আইনজীবিদের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে রয়েছে।

যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত এডভোকেট দেওয়ান তালহা কিবরিয়া ভার্চুয়াল আদালত বিষয়ে তার বক্তব্যে বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ন তিনটি বিভাগের একটি বিচার বিভাগ। গত ১১ই মে থেকে ২৫ই জুন পর্যন্ত ভার্চুয়াল আদালতে প্রায় ৮৪হাজার ৬শত ৫৭টি মামলার জামিনের শুনানি হয় এতে ৪৪হাজার ৮শত ২ জনকে আদালত জামিন দিলেও অন্যান্য সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আদালতে ভার্চুয়াল কার্যক্রম চলমান থাকলেও আইনজীবিদের মামলা পরিচালনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে বাইরে যেতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিচারকরা নিরাপদ থাকলেও এতে আইনজীবিদের স্বাস্থ্যঝুকিঁ থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে যেভাবে অন্যান্য দপ্তর পরিচালিত হচ্ছে সেভাবে আইনজীবিদের আয়ের কথা বিবেচনা করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আদালত খুলে দেওয়ার পক্ষে মতামত ব্যাক্ত করেন তিনি।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনজীবী যদি মামলা কার্যক্রমের সব কাজই বাইরে গিয়ে করতে হয় তাহলে ভার্চুয়াল আদালতের কোন দরকার নেই। ভার্চুয়াল আদালত আধুনিক উপায়ে সকল সুবিধা সম্বলিত হতে হবে। তিনি আরও বলেন, ভার্চুয়াল আদালত একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। মহামারি অবস্থায় হঠাৎ করে সংযোজন হওয়া এ পদ্ধতির সাথে মানিয়ে নেয়া আইনজীবিদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর কার্যকারিতায় দীর্ঘসময় অনুশীলনের প্রয়োজন। এছাড়া পর্যাপ্ত প্রশিক্ষন এবং পেশকার ও জিআর দৌড়াত্মের কারনে মামলার লিঙ্ক পেতেও দেরী হচ্ছে।

করোনা সংক্রমন কবে শেষ হবে সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত তিন অতিথিই ভার্চুয়াল আদালতের সুবিধা স্বীকার করে বলেন, আইনজীবিদের জীবন জীবিকার নিশ্চয়তায় সীমিত পরিসরে আদালত খুলে দেওয়া হোক।

অনুষ্ঠানের শেষ অংশে এডভোকেট দেওয়ান তালহা কিবরিয়া বলেন,জীবন এবং জীবিকা একে অপরের সাথে জড়িত। জীবনের অস্তিত্ব রক্ষায় জীবিকার সন্ধান আবশ্যক। তাই সরকারের কাছে আবেদন সীমিত পরিসরে হলেও আদালত খুলে দেওয়ার আবেদন আইনজীবীদের।

আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!