ভূটানের ভ্রমনলিপি, পর্ব-২ “কালিপদ দেবনাথের বিশেষ প্রতিবেদন”

166

পর্ব-২.
ভারত জয়গা ফুয়েন্টসলিং।(৬ইজুন,২০১৯)বৃহস্পতিবার।
ইমিগ্রেশন শেষ হলে সেখানের বাজারে ডলার আর টাকা যা ছিল রুপীতে রুপান্তর করে নিলাম,ভাল দাম পাওয়া যায়।আমাদের জয়গা নিয়ে যাবার জন্য ট্যাক্সি ইতিমধ্যে স্বাগত জানালো।
সীমান্ত পাড় হতেই অন্যরুপ,চাবাগান আর দুপাশের রাস্তায় গাছগাছালি।সারাটা পথ জুড়েই চাবাগান যেন আমরা সিলেট শীমঙ্গল ঘুরছি,দেশের মায়া কাজ করে চাবাগান দেখে।
পথে অনেকগুলো নদীর চর দেখা গেল, একফোঁটাও জল নেই।
অথচ বর্ষাকালে জলের তান্ডবে মানুষের কত ভোগান্তি,রাস্তাঘাটও ভেঙে চুরমার।
জয়গা যাওয়ার রাস্তায় সবচেয়ে বড়বাঁধা বড়বড় ট্রাকলড়িগুলো,মাইক্রো চালককে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত রাখে।
না হয় অপরুপ রাস্তায় কি আনন্দটাই না উপভোগ করব যেতো,সবচেয়ে সবুজ চাবাগানটার সামনে দাঁড়ালাম -কী অপুর্ব ফুটতিনেক চাগাছ তার ছাউনি হয়ে আছে কতকগুলো বিশত্রিশ ফুঁটের গাছ -দেখতে ভারী সুন্দর লাগে।
আবার সেইএকই রাস্তা পাড়ি দিয়ে জয়গা।

আমরা যখন জয়গা যাই তখন ঘড়িতে ৪.৩০.ভারতীয় ভিসা অফিসে একটু কাজ আছে,তাদের অনুমতি নিতে গেলাম।নিরিবিলি পরিবেশ-আমরা ব্যতীত আর পাঁচজন সেখানে উপস্থিত।
যাবতীয় তথ্যাদি পূরণ করে উপরে গেলাম লোকজন ডাকতে আমাদের ভিসায় একটা সিল দিন,আমরা ভুটান যামু।
কী সুন্দর এসে সিল দিল,আমরা বেড়িয়ে পড়লাম।
ভারতীয় সীমান্তে কাজ শেষ, এখন সারাদিন খাওয়া হয়নি খিদায় পেট জ্বলছে।
আবারো “ঘোষ মিষ্টান্ন ও হোটেল”।ম্যাথু জানাল এর খাবার ভাল,যখনই ভুটান যায় শেষ খাবার এইটায় ভক্ষণ করে।
খাসীর থালী অর্ডার করা হলো-দাম ১২০রুপী।
ভাত -সবজি -ডাল -আর খাসী মিলে একথালী।
খাবার মান ভাল খেয়েও আমরা তৃপ্ত,সাথে খেলাম মুখরুচক মিষ্টি আর কিছু জিলাপী কিনে নিলাম রাস্তায় খেতে হবে।
প্রচন্ড গরম আর ধুলাবালি জীবন অতিষ্ট করে দিবে জয়গা সীমান্ত।
জয়গা সীমান্ত পাড় হলাম ফুয়েন্টসলিং, সেখানে আমাদের ভুটান গাইড দর্জি ওয়াংডু অপেক্ষমান।
বলাবাহুল্য ভারতের সীমান্তের গরম আর চিপস পলিথিনের নোংরা রাস্তা ভুটান সীমান্তে একদম উধাও,এইখানে মৃদুঠান্ডা আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট।
ভুটানের ঢুকার পথের তোরণটাও বেশ রাজকীয়,দেখেই প্রাণে শান্তি আসে।
দর্জি নিজেই আমাদের পাসপোর্ট জেরক্স করলেন,পাসপোর্ট তথ্যাদি পূরণ করে,ইমিগ্রেশন সেন্টার নিয়ে গেলেন।
ভুটান ইমিমিগ্রেশিন ভবনটা ছোট কী সুন্দর পরিপাটি,ভেতরটাও সুন্দর নকশা করা।
খুব সাদরে আমাদের তথ্যাদি জিজ্ঞ্যেস করে বাহিরে অপেক্ষা করতে বললেন,মিনিট পাঁচেক পর পাসপোর্ট নিয়ে হাজির,আমরা মুগ্ধ।
নরক থেকে যেন আমরা স্বর্গে আসলাম,যেখানে সবই পরিপাটি ও নিয়মতান্ত্রিক।
ভুটানে প্রথমেই রাস্তা পাড় হতে আমরা ভুল করলাম দর্জি সংশোধন করে দিলেন,জেব্রাক্রসিং দিয়ে পাড় হতে হবে,না হয় জরিমানা গুনতে হবে।
ভুটান ইমিগ্রেশনের কাজ সমাপ্তি হল এখন আমরা সেখানকার সিম নিলাম,ইন্টারনেট আর সিম খুব দাম।
সীমিত ইন্টারনেট আর মিনিট নিলাম,সিমের মেয়াদ একমাস।

এইবার সবাই মিলে ওয়াইনশপে গেলাম,কীসুন্দর হরেকরকম বোতল সাজানো,পানের চেয়ে দর্শন উত্তম।
আমাদের সাথের যারা পান করবে তা নিয়ে নিল আরো কিছু পানীয় আর চিপস নেয়া হল।
ম্যাথু পরিপাটি এইশহরেই রাতটা থেকে যাবে, সকালে শিলিগুড়ি হয়ে ভুটান যাবে।
আমরা যখন থিম্পুর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম ঘড়িতে ৭.৩০.
দর্জি ওয়াংচু ইতিমধ্যে সবার সাথে পরিচয় হয়ে নিলেন,শুরুর দিকে সূর্যডোবা লালপাহাড় দেখা ব্যতীত অন্ধকারে ভুটানের রাস্তা দেখার কিছু নেই বরং দর্জির গাওয়া ইংরেজি গান শোনা শ্রেয়।
একনাগাড়ে পাহাড় বেয়ে উঠছি আর নামছি মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা আর কান বন্ধ হয়ে আসছে।
চুপকরে ঘুম দিলাম কিছুটা সাধারণ হল,সমুদ্র পৃষ্ট হতে উপড়ে যেতে এইটা হয় স্বাভাবিক ব্যাপার।
চুকাদাম পৌঁছে দর্জি একটা রেস্টুরেন্ট এ থামাল,এইখানেই রাতের খাবার খেতে হবে।
থিম্পু পৌঁছে কিছুই পাবনা ইতিমধ্যে থিম্পু ঘুমন্ত শহর।
ফ্রাইড রাইস আর চিকেনকারী দিয়েই রাতের খাবার হল,ডাউকি যেতেও আমরা এইখাবারটা খেয়েছিলাম অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু।
আবার গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু,গুড়িগুড়ি বৃষ্টি রাস্তা পিচ্ছিল চাইলেও গতি দেয়া যায়না।
তাছাড়া ভুটানে রাস্তা খালি থাকলেও নির্দিষ্ট গতিতেই গাড়ি চালায়।
হাড়কাপুনি ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি, ইতিমধ্যে সবাই সুয়েটার পরিধান করে নিলাম।
রাস্তার দুপাশে নালনীলসবুজ রেডিয়াম ছোটছোট বাতি,ইহা ভুটানে রাত্রিবেলা পথ নির্দেশক।
আমার উপড়ে উঠছি কানবন্ধ হয়ে আসছে,চারপাশের আলোজ্বলা প্রকৃতি দেখেদেখে ১২.৩০ এ থিম্পু।
থিম্পু শহর নিরব কিন্তু সারাশহর আলো ঝলমল।
সাপের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা পাড়ি দিয়ে সবচেয়ে উঁচুতে “পিমা ইয়েসলিং ভিলা”.
দর্জি সেখানে নিয়ে গেল,তারপর আমাদের কক্ষগুলো আমাদের বুজিয়ে দিয়ে বিদায় নিল,কাল সকাল আটটায় দেখা হবে।
আমাদের ভিলা থেকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে এইশহর উপভোগ করা যায়।
গ্রীজার চালিয়ে স্নানপর্ব শেষ করলাম, ত্রিশঘন্টা ভ্রমণের ক্লান্তি দূর হলো।
রাত্রিরে স্বর্গীয় ভুটানে স্বর্গীয় সুখে ঘুমালাম।

চলবে….

আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!