ভূটানের ভ্রমনলিপি, পর্ব-৩ “কালিপদ দেবনাথের বিশেষ প্রতিবেদন”

180
পর্ব -৩(পিমা ভিলা)
রাতে শান্তির ঘুম হলো_দর্জির দেয়া আটটার টাইম পার হয়ে নয়টা।এমন শীতে ঘুম থেকে জেগে উঠা দায় তবুও উঠলাম।
আরাম নয় ভ্রমণ করতে এসেছি,ঘুম থেকে উঠেই পুরো শহর দেখে মুগ্ধ।
আগেই বলেছি আমরা আছি শহরের সবচেয়ে উঁচুতম বাড়িতে,যেখান থেকে সবশহরটা দেখা যায়।
একদম নীচ দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে,তার পাশেই একই আকৃতির বাড়িঘরগুলো কি ছোট ছোট দেখায় কিন্তু কী সুন্দর।
পাহাড়ের গা ঘেঁষে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায় আবার কড়ারোদ আলো তাপ বিলাচ্ছে আর বুদ্ধ একজায়গায় ঠাঁয় বসে আছে -দেখছেন তাঁর শহরের অতিথি আর মানুষজন কেমন আছে?
ভুটানের আমাদের প্রথম দর্শনীয় প্রাণী বন্ধুত্বপূর্ণ কুকুরগুলো,পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন খেলনা কুকুরের মতো।
একদম গা ঘেঁষে বসে আদর চায়,কী মায়াময় ওরা।ভিলার চারপাশে নানারকম বাহারি ফুল,বন্যফুল ফোঁটে আছে।
গোলাপ নয়নতারা নাম না জানা নানফুল,গাড়ির টায়ার কেটে কি সুন্দর রঙবেরঙ এর টম বানানো হয়েছে দেখে মুগ্ধ।
ভিলার মুখেই আছে একটা হাজারী গোলাপ গাছে তা থেকে শদুয়েক ফুল ফোঁটেছে,মানুষকে প্রবেশ পথেই অভ্যর্থনা জানায়।
প্রথম দেখে ভেবেছি হয়তো কৃত্রিম ফুল,না ভাবনা ভুল আসল এবং সুগন্ধযুক্ত।
ঘাসফুল কি বিচিত্র।
ভুটানের বাড়িঘরগুলো কী সুন্দর কারুকার্য করা,অসাধারণ রঙের।
বাড়িতে আছে সবুজের সমারোহ,নানাপ্রজাতির গাছগাছালি আর ফুল।
বাড়ির ভেতরে আছে তাদের দেশের ঐতিহ্যের নানা ধারক ও বাহক।সবাই খুব মননশীল ও সৌন্দর্যপ্রেমী।
ভুটান সৃজনশীল দেশ ও তাদের জনগনও বেশ মননশীল।
পিমা ইয়েসলিং ভিলায় আরো দর্শনার্থী আছে,ওরা সবাই ভারত থেকে আগত।
বাচ্চাকাচ্চা সহ ভ্রমণে,ছোট ইশিতা খেলনাপুতুল এর মতো দেখতে কুকুরগুলো দেখে পুলকিত,সে তাদের আদর করতে চাইছে কিন্তু ওরা নড়েচড়ে এদিকওদিক যায়।
ইশিতা কান্না জুড়ে দেয় আদর দিতে না পেরে-দুদু বলে হাক ডাকে।
গাকী তার কোলেই একটা কুকুরছানা ছিল নীচে নামিয়ে ভিতরে চলে গেল,গাকী ভিলার একজন সদস্য।সমগ্র ভিলার ব্যবস্থাপনায় সে ব্যস্ত থাকে সারাদিন।
দর্জির সবেমাত্র ঘুম ভাঙলো,এসে দুঃখিত বললো।
ঘুম থেকে দেরিতে উঠার ক্ষতিটা আমাদের পুষিয়ে দিবে বলে আশ্বস্ত করলো,আমরা তাতে সন্তুষ্ট।
ভিলাতেই সকালের নাস্তা হবে -ফ্রাইড রাইস ও ভেজিটেবল আবারো সুস্বাদু খাবার খেয়ে তুষ্ট।অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশ আর সুন্দরী গাকী নিজেই কিচেন চালায়। ভেতরকার অসাধারণ সবচিত্রকর্ম সাজসজ্জা ঘুরে দেখলাম।
নানারকম বুদ্ধিক নিদর্শন, নানা প্রেষণামূলক বানী ঝুলানো।
আছে লাফিং বুদ্ধা,যিনি সদা হাস্যরত।
রাজারানীর কি সুন্দর ছবি।
লাফিং বুদ্ধার বর্ণনা-
প্রথমেই বলে রাখি এর নাম ‘লাফিং বুদ্ধ’। মাথায় রাখতে হবে, এই বুদ্ধ আর গৌতম বুদ্ধ কিন্তু এক মানুষ নয়। আশা করি অনেকেই এর নাম শুনেছি। সৌভাগ্যদায়ী হিসেবে এই স্ট্যাচুর উপস্থিতি আমাদের অনেকের ঘরেই দেখা যায়। অনেককেই দেখা যায় এর পেটে হাত বুলাতে। এতে নাকি সৌভাগ্য আসে, উন্নতি আসে। কিন্তু কে এই লাফিং বুদ্ধ?
লাফিং বুদ্ধের আসল নাম হোতেই বা পু-তেই। আজ হতে প্রায় ১০০০ বছর আগে চীনে জন্ম হয় এই ‘চাইনিজ জেন’ বা সন্ন্যাসীর। সর্বত্র তার পরিচিতি ছিলো প্রফুল্ল এবং হাসিখুশি একজন মানুষ হিসেবে। চারিত্রিক ভাবে তিনি অত্যন্ত হিতৈষি ছিলেন যার কারনে তাকে বোধিসত্ত্ব অবতার বা মৈত্রেয় বলা হত।
ওনার বাড়ন্ত ভুড়ি আর মুখ ভর্তি হাসির কারণে তার উপস্থিতি সবক্ষেত্রেই অনেক মজাদার ছিলো। শোনা যায় তিনি যেখানেই যেতেন সেখানেই মানুষ তাকে ঘিরে জড়ো হত। আর তিনিও নিজের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে সবাইকে মজা দিতেন। আর এই কারনেই তার নাম হয়ে গেলো ‘লাফিং বুদ্ধ’।
এই মানুষটির মধ্যে অনন্যসাধারণ কিছু গুণ ছিলো। খুব সাধারণ কিছু গুণ হলেও তার অন্তর্নিহিত অর্থগুলো ছিলো খুবই গভীর। তার গুণের কথা গুলো বলার আগে এই মজাদার মানুষটি সম্পর্কে একটি ছোট্ট গল্প বলি।
শোনা যায় লাফিং বুদ্ধ সর্বদা এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়াতেন। কাধে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে সে বেড়িয়ে পড়ত শহর ভ্রমনে।
ব্যাগ ভর্তি কি থাকতো জানেন?
চকলেট, লজেন্স এসব। তার মজাদার দেহভঙ্গি দেখে বাচ্চাকাচ্চারা সব তাকে ঘিরে ধরত। আর এই সব বাচ্চাদেরকেই তিনি চকলেট বিতরণ করতেন।
শুধু চকেলট দিয়ে চলে যাওয়ার মানুষ তো তিনি ছিলেন না। তিনি কি করতেন চকলেট দেওয়া শেষ হলে তার কাধেঁর ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে রাখতেন আর আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে সজোরে হাসতে শুরু করতেন। তার সাথে কেও হাসছে কি হাসছে না তা তার দেখার বিষয় না। তিনি নিজের মনের মত হেসেই চলতেন। কিন্তু দেখা যেত তার হাসি, সংক্রমণ হাসির মত ছড়িয়ে পড়ত সবার মাঝে। শহরভর্তি মানুষের মাঝে বয়ে যেতো হাসির রোল।
তার এই সব কাণ্ড কারখানা দেখে হয়ত অনেকেই ভাববেন লোকটার কি মাথা নষ্ট। কিন্তু তা নয়। তার সকল কাজের পিছনেই ছিলো তার নিজস্ব কিছু গভীর উপলদ্ধ্বি। তাকে প্রশ্ন করা হল, বাচ্চাদের মাঝে চকলেট বিতরনের উদ্দেশ্য কী?
তার সহজ সরল জবাব টা কি ছিলো জানেন?
‘আপনি যতো দেবেন ততোই পাবেন। জগতের নিয়মই এটা। তাই যতোটা সামর্থ্য দিয়ে যান, তার দ্বিগুণ আপনি ফেরত পাবেন।’
তার কাধের ঝোলানো ব্যাগের পিছনের কাহিনীটাও অনেক সুন্দর। তিনি বলতেন তার এই ব্যাগ প্রত্যকের জীবনের দুঃখ, কষ্ট, সমস্যা – এসবের প্রতীকী স্বরূপ। আপনারা হয়ত ভাবছেন কিভাবে? ব্যাখ্যা দিচ্ছি।
 
আমাদের কাছের কেও যদি কোন সমস্যায় পরে তখন তাকে আমরা অনেক ভাবেই সাহায্য করি। সমস্যা হতে উত্তরণের পথ বাতলে দেই, তার পাশে থেকে তাকে সাহায্য করি। নিজেরা তখন অন্যের কাছে সমস্যা হতে উত্তরণের একজন পথপ্রদর্শক।
কিন্তু আমরা নিজেরা যখন সমস্যায় আক্রান্ত হই তখন আমরা এতোটা সহজে নিজেদের সমস্যা হতে উত্তরণের পথ কি খুজে পাই? উত্তরটা অবশ্যই ‘না’।
কারণ আমরা যখন সমস্যার সংস্পর্শে আসি তখন তা থেকে বের হওয়ার রাস্তাটুকু খুজে বের করা আমাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পরে। তার মানে আমদের সমস্যা, সমস্যার সাথে সম্পৃক্ততায়।
আর এই সমস্যার সমাধান দিয়েছেন লাফিং বুদ্ধ। তিনি বলেছেন, আমাদের জীবনে সমস্যা গুলো কাধের ব্যাগের মত।যতক্ষন এরা কাধে থাকবে ততক্ষণ এর ভাড়ে এর থেকে পরিত্রাণের উপায় পাওয়া কষ্টকর।তাই ব্যাগটি কাধ হতে নিচে নামিয়ে রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে হাসতে হবে। অর্থাৎ সমস্যা থেকে বিচ্যুত হয়ে সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে, তবেই সমস্যা হতে উত্তরণের পথ বের হবে।
হাসার গুরুত্ব আমাদের জীবনে অনেক। ক্ষনিকের হাসি আপনার জীবনের রসায়নকেই বদলে দেয়। এই মানুষটি তাই সারাজীবন হাসার উপরেই গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। তার হাসির গুরুত্ব বুঝতে পেরে তৎকালীন বুদ্ধ এবং শিনতো সম্প্রদায়ভুক্ত অনেকেই মোক্ষ লাভের মত বিষয় গুলোতেও অনেক সচেতন হয়ে ছিলেন।
এবার সময় এলো লাফিং বুদ্ধের মহাপ্রয়াণের। শাস্ত্রমতে, সন্ন্যাসীদের কবর দেওয়ার রীতি থাকলেও, তিনি তার শেষ ইচ্ছায় বলে গিয়েছিলেন যাতে করে তার শেষকৃত্য আগুনের মাধ্যমে করা হয়। তাঁর শেষ ইচ্ছের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার অনুসারীরা তার মৃত্যুর পর তার শবদেহটিকে আগুনে তোলে।
কিছুক্ষণ পরে সবাই এক অবাক করা দৃশ্যের স্বাক্ষী হল। কথিত আছে, তাঁর শবদেহটি থেকে মুহুর্মুহু আতশবাজির স্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকলো। মৃত্যুর মত এমন কষ্টদায়ক পরিবেশেও কিঞ্চিত হাসির উপস্থিতি দেখা গেলো সবার মাঝে।
বোঝা গেলো,মৃত্যুর আগে তিনি তার পোশাকের ভিতরে আতশবাজি ভর্তি করে রেখেছিলো। যাতে করে, সদাহাস্য এই মানুষটির জীবনের শেষ দিনেও সকলে তাকে হাসি মুখে বিদায় জানাতে পারে।
আর এই কারণেই তার ‘লাফিং বুদ্ধ’ নামটির সার্থকতা, হাজার বছর পরেও আলো ছড়াচ্ছে হাজারো মানুষের হৃদয়ে।
বুদ্ধার বর্ণনা উইকিপিডিয়া।
আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!