মায়ের দোয়া ও ইচ্ছে শক্তি দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

707

সাইফুল ইসলাম আপন।। আজ আপনাদের সকলকে দুটি গল্প শুনাবো একজন মায়ের দোয়া কিভাবে তার সন্তানের জীবন পাল্টে দিতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ।জীবন যেখানে আপনাকে অসফলতা দেখাবে আপনাকে সেখানে সফলতা খুজঁতে হবে,সমাজের মানুষ যেখানে আপনার ভিতর অসামর্থ্যতা দেখবে আপনাকে অসামর্থ্য শব্দের ‘অ’ অক্ষরটি কেটে নিজেকে সামর্থ্যবান প্রমাণ করতে হবে।জীবনের যে প্রান্তে সব আলো নিভে  শুধুই অন্ধকার দেখা যায় সে অন্ধকারে নিরুপায় হয়ে মানুষ যখন আলোর খোজঁ করে তখন সেই গভীর অন্ধকারে যে হাতটি তাকে আলোর দিশা দেখায় সেই হাতটি হলো মায়ের।তাই সৃষ্টি কর্তা বলেন মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।

আপনাদের সকলেরই মনে আছে হয়তো একজন মানুষের কথা যিনি হলেন ঢাকা শহরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। তিনি একটা জায়গায় বক্তব্য দিতে যান সেখানে গিয়ে তার জীবনে মায়ের তাৎপর্য কি তা তুলে ধরেন।তিনি বলেন মানুষ স্বপ্নের সমান বড়ো কখনও কখনও মানুষ স্বপ্নের চেয়েও বড়।মানুষ ৯৫ বছর বয়সেও স্বপ্ন দেখে স্বপ্ন মানুষকে বাঁচতে শেখায়।যদি হাওয়া খেতে হয় নদীর তীরে যেতে হবে, যদি সুন্দর সমুদ্র দেখতে হয় কক্সবাজার যেতে হয়,যদি পাহাড় দেখতে হয় হিমালয় পর্বতে যেতে হয়,আর যদি ভালো মানুষ হতে হয় তবে ভালো মানুষের সাথে চলতে হয়, ভালো মানুষের বই পড়তে হয়।জীবনে ভেঙে পড়লে চলবে না স্বপ্ন দেখতে হবে তাকে বাস্তবে রুপ দিতে হবে থেমে গেলে চলবে না।তিনি বলেন তার একবার প্রচুর জ্বর হয় শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারনে তিনি ভালোভাবে পড়তে পারেননি তিনি যখন তার মায়ের কাছে বলেন যে মা, এইবার বুঝি আর হলো না রক্ষা। তার মা তাকে বললেন কিছু হবেনা কাছে আয় একটা ফু দিয়ে দেই। পরীক্ষার হলে মায়ের সাথে যাওয়ার পর তার মা দাড়িয়ে থাকে অপেক্ষা করে সন্তানের জন্য।নামাজ আদায় করে দোয়া করে অতঃপর পরীক্ষা শেষ করে বাইরে আসলে মা তাকে জিজ্ঞেস করে কেমন হলো তিনি বলেন ভালো না ৩৪ উত্তর করেছি,মা তোমার ফু এ বুঝি আর কাজ হলো না। তার মা বলেন পাস কতো তে? তিনি বললেন ৩৩ এ।তার মা দোয়া করলেন সে বছর তিনি ৩৪ উত্তর করে ৩৪ পেয়েই পাস করেছিলেন।আজব মনে হলেও পৃথিবীতে মা হলো স্রষ্টার বড় নেয়ামত।তিনি বলেন তিনি যখন মেয়র নির্বাচন করবেন তার আগেও মা এর কবরে যান মায়ের ফু আনতে মায়ের দোয়ার বরকতে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন।

মা এক অক্ষরে এমন এক শব্দ যা ব্যাখ্যা করলেও অফুরন্ত থাকে।তিনি আর একজন মায়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন আরও একজন মা ছিলো যার ছেলে ১৯৭১ এ আটক হলে তিনি দৌড়ে ছেলেকে দেখতে যান।তার ছেলে তাকে কেঁদে বলে যে মা তারা আমায় খেতে দেয়না,একথা শুনে পাগল হয়ে মা ছুটে যায় ৩ ঘন্টা পর খাবার নিয়ে আসে ছেলের জন্য কিন্তু এসে আর ছেলের দেখা পায়নি। সে ছেলেকে আর খুজে পাওয়া যায়নি। ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে না পেরে সেই মা ১৫ বছর ভাতের এক লোকমা ও মুখে তোলেনি এই হলো মা।যিনি পরবর্তী সময়ে মারা যান।তিনি বললেন তার মা না থাকলে তিনি আনিসুল হক হতে পারতেন না।তার জীবনে মায়ের দোয়া অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিলো।

আর একজন মায়ের কথা বলি যিনি ছিলেন পাকিস্তানের লৌহ মানবী বলে পরিচিত মুনিবা মাজারি এর মা।মুনিবা মাজারি পাকিস্তানের বেলুচ শহরে বসবাস করতেন। সেখানে ভালো মেয়েরা কখনও মা বাবার কথার উপর না করেনা।তার বাবা তাকে বিয়ে দিতে চায়,বলে যে এটায় সে অনেক সুখী হবে তিনি না করেননি।মাত্র ১৮ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায় তবে বিবাহিত জীবন টা তার সুখের ছিলো না, বিয়ের ২ বছরের মাথায় তিনি আর তার স্বামী বেড়াতে গিয়ে মারাত্মকভাবে একটি দুর্ঘটনায় আহত হন।তার স্বামী গাড়ি চালাতে গিয়ে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েন, এতে গাড়িটি গর্তে পড়ে যায়। তার স্বামী তাকে ফেলে বেড়িয়ে চলে আসে এবং সামান্য আহত হয়।তবে তিনি মারাত্মক ভাবে আহত হন এ ঘটনার বর্ননা করতে গিয়ে তিনি বলেন তার স্বামী যেভাবে বিপদে তাকে ফেলে বেড়িয়ে যায় এবং নিরাপদ থাকে এর জন্য তিনি আনন্দিত

সেদিন তাকে অনেক লোকেরা উদ্ধার করে জলদি সিপিআর দিয়ে করাচির একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে আড়াই মাস কাটাতে হয়। তার হাতের,পায়ের কব্জির,মেরুদণ্ড ও পাজরের হাড় ভেঙে যায়। ডাক্তাররা ৩ টা মেজরও দুটো মাইনর সার্জারী করে অনেক লৌহ দন্ড তার ভাঙা যায়গায় স্থাপন করেন।তাই তাকে পাকিস্তানের লৌহ মানবী বলা হয়।ডাক্তার ১ম দিন এসে তাকে বলেন শুনেছি আপনি চিত্রকর হতে চেয়েছিলেন আমি দুঃখিত আপনাকে বাকি জীবনটা গৃহীনি হয়ে থাকতে হবে।কারন আপনার হাতের হাড় গুলো অনেক ভাঙা।তিনি একথা শুনে চুপ করে ছিলেন।২য়দিন তাকে ডাক্তার এসে বলেন আপনার জন্য আরও একটা খারাপ খবর আছে আপনার পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় আর দাড়াতে পারবেননা।তিনি একটা দীর্ঘদিন শ্বাস নিয়ে বলেন ঠিক আছে।কিন্তু সমস্যা হয় ৩য় দিন ডাক্তার আসে কিছু বলতে তিনি ভাবলেন ডাক্তার তাকে নতুন কি খবর দিবে,তবে ডাক্তার যা বললেন তার ভাষায় এটি শুনে সহ্য করার ক্ষমতা কোন নারীর নেই।ডাক্তার বলেন আপনার কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ায় আপনি কোনদিনই আর মা হতে পারবেননা।সকল দুঃখ, কস্ট আপনজনের ছেড়ে যাওয়ার কোন ঘটনা তাকে এভাবে ভাঙতে পারেনি।তিনি তার মা কে প্রশ্ন করলেন যে কেন তিনি বেঁচে রইলেন ও-ই দিন ই কেন মরলেননা কেন মরলেনা।কেন বাঁচবেন তিনি কি নিয়ে বাঁচবেন।তখন তার মা তাকে বলেন ভেঙে পড়োনা স্রষ্টা নিশ্চয়ই তোমার জন্য ভালো কিছু রেখেছেন, আমি জানিনা সেটা কি তবে নিশ্চয়ই তুমি তা পাবে।সে দিন তার মায়ের দোয়া তার সাথে ছিলো তার জীবনে ২ টা ভয় ছিলো একটা হলো ডিভোর্স অন্যটা মা হতে না পারা।তিনি তার মায়ের অনুপ্রেরণায় সকল ভয় কাটিয়ে উঠেন স্বামীকে ডিভোর্স দেন এবং যখন জানতে পারেন যে তার স্বামী নতুন বিয়ে করছে তাকে শুভকামনা জানিয়ে বার্তা পাঠান।তিনি ভাবলেন যে মা না হওয়ার কস্ট কেন তিনি পাবে এমন রাস্তায় কতো ছেলে মেয়ে থাকে তাদের কে কেও সন্তান হিসেবে নিতে চায়না।

আমি কাওকে দত্তক নিলেই হয়!কেন এসব ভেবে কস্ট পাবো, যে ভাবনা সে অনুযায়ী খোজঁ নিয়ে একটি ছেলেকে দত্তক নেন যার নাম রাখেন নীল মাজারি তখন বাচ্চাটির বয়স ২ মাস। এভাবে মায়ের দোয়ার কারনে ও অদম্য ইচ্ছেশক্তির বলে তিনি হয়ে উঠেন এক বিশ্ব তারকা।তার দূরদর্শিতা ও দুর্বার মনোভাবের জন্য ‘ইউ এন উইমেন পাকিস্তান’ ও ‘ন্যাশনাল গুডউইল’ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ২০১৫ ও ২০১৬ তে জায়গা করে নেন যথাক্রমে ‘বিবিসি ইন্সপিরেশনাল উইমেন’ এবং ‘ফোর্বস থার্টি আন্ডার থার্টিতে’ এ ছাড়াও ‘মিরাকেল উইমেন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন পন্ডস মিরাকেল উইমেনে।মায়ের দোয়ার বরকতে ও নিজের ইচ্ছেশক্তির কারনে ২০০৭ এর সেই ঘটনার পর ১৯ মে ২০১৮ সালে রোবোটিক্স সাপোর্ট সিস্টেমের মাধ্যমে দশ বছর পর প্রথম নিজ পায়ে দাঁড়ান মুনিবা মাজারি।মায়ের দোয়া ও নিজের ইচ্ছেশক্তি কিভাবে কাজে লাগে এটি তার আরও একটি সত্য উদাহরণ।

তিনি তার আড়াই মাসের হাসপাতালে অবস্থান কালে তার মনের জোরে প্রথম যে চিত্র আঁকেন সেটি তার মৃত্যুর চিত্র।মানসিক ভাবে নিজেকে গুছিয়ে নেন ২ বছর বিছানায় থাকাকালে ভাবতেন আর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে মনে বলতেন মানুষ কতোটা ভাগ্যবান যে তারা প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য দেখতে পায়, অথচ দুর্ভাগ্য তাদের তারা তা বুঝতে পারেনা। এভাবেই মায়ের দোয়া এবং অনুপ্রেরণা তার জীবন পাল্টে দেয়।পৃথিবীতে আমার আপনার ভাবনার সাথে মা বাবার ভাবনার মিল নাই থাকতে পারে তাই বলে তাদের ভুল বুঝবেননা।তারা আপনার সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভাবে তাই মা বাবার সাথে রাগ না করে নিজের ভাবনা তাদের বলুন আলোচনার মাধ্যমে সমাধা করুন।কে জানে বলুন হয়তো আপনার মা দোয়া করলেও আপনিও জীবনে বড় লক্ষ্য পৌঁছাতে পারবেন।ভালবাসা ও শ্রদ্ধা পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি।একমাত্র মা জাতিরাই পৃথিবীর এক অপার সৃষ্টি যারা সকল দুঃখ কষ্ট সত্ত্বে ও সন্তানের হাত ছাড়েনা।তাই ভয় আর অসফলতার কাছে হেরে না গিয়ে অনুপ্রাণিত হও মা কে দেখে।

লেখকঃ সাইফুল ইসলাম আপন
অনার্স ৪র্থ বর্ষ(অর্থনীতি)
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ
ইমেইল- saiiifullcvceco@gmail.com

আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!