মিতু হত্যার পর বাবুলের তিন বিয়ে

77

মাহমুদা খানম মিতু হত্যার পর আরও তিনটি বিয়ে করেন তার স্বামী পুলিশের সাবেক এসপি বাবুল আকতার। এর মধ্যে দুজনের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, বর্তমানে একজনের সঙ্গে সংসার করছিলেন তিনি।

মিতুর মা শাহিদা মোশাররফ বুধবার দুপুরে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘মিতু মারা যাওয়ার আগে বাবুর (বাবুল আকতার) সঙ্গে ভারতের এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। মিতু কৌশলে সেটা জেনে যায়। শুধু ওই নারী নয়, আরও কয়েক জনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। যাদের মধ্যে দুই জনকে নিয়ে মিতুর মৃত্যুর পর সে সংসার করেছে। আরেকটি বিয়ে করেছে পারিবারিকভাবে।’

মিতুর মা জানান, চট্টগ্রামে থাকার সময় ওয়েল ফুডে চাকরি করা এক নারীর সঙ্গে বাবুলের পরিচয় হয়। মিতু মারা যাওয়ার পর ওই নারীকে ঢাকায় এনে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন বাবুল। এক পর্যায়ে ওই নারী বাবুলকে ছেড়ে চলে যান।

এরপর খুলনার এক মেয়েকে বিয়ে করেন বাবুল। তবে ওই সংসারও বেশি দিন টেকেনি। সবশেষ ৪-৫ মাস আগে কুমিল্লার এক মেয়েকে তিনি বিয়ে করেন। মিতুর মায়ের অভিযোগ কুমিল্লার মেয়েটির সঙ্গেও বাবুলের আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল। ওই মেয়ের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে থাকছিলেন তিনি।

২০১৬ সালের ৫ জুন মিতুকে হত্যার পর বাবুল আকতার দুই সন্তানকে নিয়ে খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়ায় শ্বশুরের বাসায় ওঠেন। মিতুর মা নিউজবাংলাকে বলেন, সে সময় বাবুলের কান্না ও ‘নিখুত অভিনয়’ তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল। তবে সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবুল সম্পর্কে তাদের ভুল ধারণা ভাঙতে শুরু করে।

শাহেদা মোশাররফ বলেন, ‘তিন বছর আগে হঠাৎ করেই সে (বাবুল) আমাদের বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর আমার দুই নাতিকে নিয়ে চলে যায়।’

মিতুর দুই সন্তান নানা-নানির থেকে বিচ্ছিন্ন

মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ অভিযোগ করেন, তাদের বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বাবুল তার দুই ছেলে-মেয়েকে নানা-নানির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। তিন বছরে এক বারের জন্যও মিতুর বাবা-মার সঙ্গে তাদের দেখা করতে দেয়া হয়নি।

মিতুর ছেলে রাজধানীর একটি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে বলে জানান শাহেদা মোশাররফ। আর মেয়েকে সম্প্রতি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে।

শাহেদা বলেন, ‘আমার মেয়ে মারা যাওয়ার পর তার দুই সন্তানকে নিয়ে জীবনের বাকি সময় পার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাবুল ওদের আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে রাখছে। আমাদের সঙ্গে দেখা করতে দেয় না, কথা বলতে দেয় না, আমাদের ফোন রিসিভ করে না। বাসায় গেলে দারোয়ান দিয়ে তাড়িয়ে দেয়।

‘অথচ মিতুর বিয়ের পর ওর থাকা-খাওয়া সবকিছুর ব্যবস্থা করতাম আমরা। ওরা অন্যের বাসায় যাতে না থাকে সেজন্য আমরা ঢাকায় বাসা করে দিলাম। বিসিএসে পুলিশ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই ওরা থাকত।’

দুই নাতির জিম্মা চান নানা-নানি

মিতুকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন বাবুল আকতার। বাবুল-মিতু দম্পতির দুই সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন মিতুর বাবা-মা।

মিতুর মা বলেন, ‘এখন ওদের কী হবে? এই দুইটা মুখে দিকে তাকিয়ে কটা দিন বাঁচতে চাইছিলাম। বাবু আমাদের সঙ্গে ওদের থাকতে দিলো না। আলাদা করে দিছে। বাচ্চাগুলো সৎ মার কাছে আছে। আমরা ওদের লালন-পালন করতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাব, এই দুই শিশুকে আমাদের কাছে থাকতে দেয়া হোক।’

মিতুর বাবা-মা নিরাপত্তা শঙ্কায়

বাবুল আকতারের বিরুদ্ধে মামলার পর নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ।

তিনি বলেন, ‘পরশু দিন (সোমবার) মিতুর বাবাকে পিবিআইয়ের ঢাকা অফিসে যেতে বলা হয়। আমরা এই মামলা নিয়ে আশা ছেড়ে দিছিলাম। বিকেলে মিতুর বাবা বাসায় ফিরে এসে, শুধু বলল, মিতুর জন্য দোয়া করো, ভালো খবর আছে। আমাকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। এরপর ভোররাতে সেহরি করে তিনি চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু এই খবরটা আমরা কাউকে জানতে দেইনি। ভয় ছিল, বাবুল বা বাবুলের লোকজন জানতে পারলে কোনো ঝামেলা হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বাবুলকে পুলিশ হেফাজতে নেয়ার পর থেকেই ভয়ে আছি। গেট এখন বন্ধ করে রাখি। বাসায় আমার আরেক মেয়ে ও মেয়ের স্বামী তাদের সন্তানসহ থাকে। তাদের নিরাপত্তা নিয়েও ভয় হচ্ছে।’

মামলাটি নাটকীয়ভাবে মোড় নেয়ায় এবার সঠিক বিচারের আশা দেখছেন মিতুর মা। তিনি বলেন, ‘বাবুলের অবৈধ সম্পর্ক মিতু জেনে গিয়েছিল, এটা কি তার অপরাধ। ওকে নিয়ে সংসার না করতে চাইলে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিত। কিন্তু ওকে কেন হত্যা করল? ও (বাবুল) পরিকল্পিতভাবে আমার মেয়েকে মেরেছে, আমরা সঠিক বিচার চাই।’

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় মাহমুদা খাতুন মিতুকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। মিতুর স্বামী চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তখনকার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বাবুল আকতার সে সময় ঢাকায় ছিলেন। ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রামে। ঘটনার পরপরই চট্টগ্রামে গিয়ে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন বাবুল আক্তার। তার অভিযোগ ছিল, জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমের জন্য তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

মিতু হত্যার প্রায় তিন সপ্তাহ পর ২০১৬ সালের ২৪ জুন খিলগাঁওয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুল আকতারকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপরেই ছড়িয়ে পড়ে, বাবুলকে পুলিশ বাহিনী থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

এর দেড় মাস পর বাবুল আকতার ৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার পর মিতুর বাবা-মাও তার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলতে শুরু করেন। তবে এ বিষয়ে পুলিশ ছিল প্রায় নিশ্চুপ। এরপর আদালতের নির্দশনায় গত বছর এ মামলার দায়িত্ব ডিবির কাছ থেকে বুঝে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

প্রায় দেড় বছরের চেষ্টায় নতুন ক্লু পেয়ে মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে পিবিআই। মিতু হত্যা মামলার বাদী বাবুলই এখন নতুন করে হওয়া মামলার মূল আসামি।

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় বুধবার নতুন এই হত্যা মামলা করেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন। এতে বাবুলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পিবিআই।

আরো পড়ুনঃ
error: Content is protected !!