লাকসামে অর্ধশতাধিক ভূমিহীন পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

মোজাম্মেল হক আলম, লাকসাম।।

19
বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন আলী আশ্রাফ (৮০)। মাথাগোঁজার মত ভিটেমাটি নেই। স্ত্রী-পরিবার নিয়ে গত ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন খালপাড়ে। তার পাশে ছোট্ট কয়েকটি ঝুপড়িতে বাস করছেন খালপাড়ের প্রথম বাসিন্দা মৃত ফজর আলীর ৫ ছেলে ও ২ মেয়ে। বড় ছেলে জহির (৪৫) পেশায় একজন রিক্সাচালক। বাকীরাও দিনমজুর।
একইভাবে মৃত কোরবান আলীর ছেলে আব্দুর রশিদ ও আনু মিয়ার মেয়ে পারভীন বেগমও লাকসাম পৌর এলাকার গন্ডামারা গ্রামের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া কালোরা খালপাড়ের বাসিন্দা। আর এদের মত আরো অর্ধশতাধিক ভূমিহীন পরিবার গত কয়েক যুগ ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে এই খালপাড়ে।
আশির দশকে পাশ্ববর্তী পেঁচরা গ্রাম থেকে এসে সর্বপ্রথম এই খালপাড়ে জীবনযুদ্ধের তাঁবু গাড়েন ভূমিহীন মৃত. ফজর আলী। তার দেখাদেখি একে একে আরো কয়েকজনও আসতে শুরু করেন। বর্তমানে গন্ডামারা-কোমারডাগা পর্যন্ত কালোরা খালপাড়ের প্রায় ৩ কিলোমিটার অংশ জুড়ে রয়েছে অর্ধশতাধিক পরিবারের ৩ শতাধিক বাসিন্দা। অস্থায়ী এই বাসিন্দাদের দুর্ভোগের যেন অন্ত নেই। এখানে নারী-পুরুষ সবাই শ্রমজীবি। কেউ মাটিকাটা শ্রমিক, কেউবা গৃহকর্মী। এনজিও সংস্থার সহায়তায় খালপাড়ে ঘর নির্মাণ করে মাথা গুঁজেছেন ঠিকই; কিন্তু এদের অনেকেই নিজ সন্তানদের পাঠাতে পারেননি পাঠশালায়। এসব পরিবারের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও জীবন-জীবিকার তাগিদে অপরিপক্ব বয়সেই ঝুঁকে পড়ছে শ্রমে।
নিজস্ব মসজিদ-মক্তব না থাকায় পাশ্ববর্তী এতিমখানায় চলে তাদের ধর্মীয় চর্চা। মৃত্যুর পর দাফনও করা হয় লাকসাম দৌলতগঞ্জ এতিমখানার কবরস্থানে। পুকুর না থাকায় গোসল এবং ধোয়ামোচার কাজে ব্যবহার করতে হয় খালের দূষিত পানি। খাবার পানির ক্ষেত্রেও জোটে না আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েল। দূষিত পানি, দূষিত বাতাস আর ধূলোবালির সংস্পর্শে থাকায় সারাবছর রোগবালাই তাদের পিছু ছাড়ে না। আধুনিক শহরের বুকে এ যেন এক অভিশপ্ত নগরী।
খালপাড়ের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০০২ এবং ২০০৭ সালে তারা প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। পরবর্তীতে একাধিক বার ভূমি অফিসে আশ্রয়ণের জন্য দরখাস্ত করেও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলাম তাদেরকে পুনর্বাসন এবং সার্বিক সহায়তার আশ^াস দিয়েছেন। (তৎকালীন এমপি) বর্তমান এলজিআরডি মন্ত্রীর নির্দেশেই গ্রামের অন্যান্য দরিদ্র পরিবারের মত তারাও পাচ্ছে ভিজিএফ সুবিধা। তবে সাময়িক সহায়তায় সন্তুষ্ট নয় অর্ধশতাধিক পরিবারের কর্তারা। তারা স্থায়ী পুনর্বাসনের অপেক্ষায় দিন গুনছে নীরবে নিভৃতে।
খালপাড়ের ভূমিহীন বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে জানতে চাইলে পৌর মেয়র অধ্যাপক আবুল খায়ের বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে সরকারী নির্দেশে খালপাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে দিতে চাইলে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় আমাদেরকে নিষেধ করেন। মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে তাদেরকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে পুনর্বাসন করা হবে।’
আরো পড়ুনঃ