জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দশানী নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে প্রশাসনের অভিযানেও থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। উপজেলার সাজেলের চর, হরিনধরা, চতলাপাড়া, টাবুর চরসহ নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীতীর ঘেঁষে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। উত্তোলিত বালু নদীর পাড়ে স্তূপ করে পরে ট্রাক্টর, ট্রলি ও অন্যান্য যানবাহনে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, যেসব এলাকায় নদীভাঙন ঠেকাতে সরকারিভাবে অর্থ ব্যয় করে জিওব্যাগসহ বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কাজ করা হচ্ছে, সেসব এলাকার কাছাকাছি যদি নির্বিচারে বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে সরকারি উদ্যোগ কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দশানী নদীর ভাঙনে সাজেলের চর বাজার ও সেতু ঝুঁকিতে পড়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে হরিনধরা এলাকায় নদীভাঙন রোধে জরুরি প্রকল্পের আওতায় জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজও শুরু হয়েছে।
একদিকে ভাঙন রোধে সরকারি কাজ, অন্যদিকে বালু উত্তোলন স্থানীয়দের অভিযোগ, দশানী নদীর সাজেলের চর থেকে হরিনধরা, চতলাপাড়া, টাবুর চরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে নদীর তীরের কাছাকাছি ড্রেজার বসিয়ে তলদেশ থেকে বালু তুলে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও উত্তোলিত বালু নদীর পাড়েই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পরে সেগুলো বিভিন্ন যানবাহনে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নদীতীর ঘেঁষে এভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ও তীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভাঙন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে সাজেলের চর বাজার ও সেতু, চতলাপাড়া, হরিনধরা ও টাবুর চর এলাকার বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অভিযান হয়, পরদিনই আবার ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হয় !
স্থানীয়দের ভাষ্য, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় ড্রেজার মেশিন সরিয়ে নেওয়া হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই আবার শুরু হয় বালু উত্তোলন।
এতে প্রশ্ন উঠেছে অভিযানের খবর আগে থেকেই পৌঁছে যাচ্ছে কার কাছে? আর অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই কীভাবে আবার একই এলাকায় ড্রেজার বসানো হচ্ছে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, অভিযান হলে কিছু সময়ের জন্য মেশিন বন্ধ থাকে। এরপর আবার আগের মতো বালু তোলা শুরু হয়। এভাবে চলতে থাকলে নদী, ব্রিজ, রাস্তা, জমি ও বাড়িঘর রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কার ছত্রছায়ায় চলছে বালুর রমরমা বাণিজ্য?
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পয়েন্টে বালু উত্তোলন চললেও স্থায়ীভাবে তা বন্ধ হচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কার ছত্রছায়ায় চলছে এই বালু বাণিজ্য?
শুধু ড্রেজার মেশিন সরিয়ে দিয়ে দায় শেষ করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে বালু পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারি অর্থ ব্যয়, আবার সেই নদীই ঝুঁকিতে নদীভাঙন থেকে জনপদ রক্ষায় সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নদীর তীর রক্ষা, বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললে এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়।
একদিকে জনগণের সম্পদ রক্ষায় সরকারের কোটি কোটি টাকার উদ্যোগ, অন্যদিকে সেই নদীর বালু লুটের অভিযোগ এ যেন একই নদীতে দুই বিপরীত চিত্র।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, প্রশাসন যদি জানে কোথায় কোথায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তাহলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে না কেন? অভিযান পরিচালনার পরও যদি পরদিন আবার একই কার্যক্রম শুরু হয়, তাহলে নজরদারির ঘাটতি কোথায় সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থায়ী সমাধানের দাবি এলাকাবাসীর দাবি, সাজেলের চর, হরিনধরা, চতলাপাড়া, টাবুর চরসহ দশানী নদীর সব ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে। অবৈধ ড্রেজার জব্দ করে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযানের পর পুনরায় বালু উত্তোলনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিও তদন্ত করতে হবে।
তাদের ভাষায়, নদী রক্ষা শুধু অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না অভিযানকে কার্যকর ও স্থায়ী করতে হবে। নইলে একদিকে সরকারি অর্থে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলবে, আর অন্যদিকে অবৈধ বালু ব্যবসায়ীরা নদীর তীর কেটে সেই উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দেবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ্ মো.জুবায়ের জানান,অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমরা একাধিক অভিযোগ পেয়েছি। এর আগে ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, তবে অভিযানের সময় সেখানে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কাউকে পাওয়া যায়নি।
এরপরও যদি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়, তাহলে আবারও অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে হরিণধরা এলাকায় বালু উত্তোলনের বিষয়টি জিওব্যাগ ফেলানোর কাজে ব্যবহারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের অনুমতিক্রমে করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, জামালপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী নকিবুজ্জামান খান বলেন, নদীভাঙন ঠেকাতে যেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে, সেখান থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রধান সম্পাদক: হুমায়ুন কবির রনি
মোবাইল: ০১৭১৬-৫৩০৫১৪
ইমেইল: onnews24@gmail.com
www.onnews24.com