একদিকে তিস্তার গ্রাস, অন্যদিকে ‘আগুন খাওয়া’ পার্টির চাঁদাবাজি, নদীপাড়ে থমকে গেছে বাঁচার আশা
নীলফামারী প্রতিনিধি।

তিস্তার আগ্রাসী রূপ প্রতিবছর কেড়ে নেয় শত শত মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই। নদীভাঙন যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, ঠিক তখনই নীলফামারীর ডিমলায় থমকে গেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী রক্ষা বাঁধের কাজ। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং তা না পেয়ে মালামাল লুটের কারণে এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটছে তিস্তাপাড়ের হাজারো অসহায় মানুষের।
গত ১৫ জুলাই ২০২৬, বুধবার দুপুরে ডিমলা থানার ছোটখাতা গ্রোয়িং বাঁধ এলাকায় নেমে আসে এই বিপর্যয়। তিস্তার ভাঙন ঠেকাতে মেসার্স সোয়েব ট্রেডার্স -এর অধীনে সাব-কন্ট্রাক্টর মোঃ আজম আলী যখন বাঁধ নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায় স্থানীয় এক প্রভাবশালী চক্র।
এক লাখ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঠিকাদারকে মারধর করতে উদ্যত হয় এবং সাইটে থাকা সাড়ে চার লক্ষ টাকার নির্মাণ সামগ্রী (৫০০ পিস জিও ব্যাগ, ৫০টি টিউব ও ২০০ ফিট পাইপ) জোরপূর্বক লুট করে নিয়ে যায়।
এসময় বাধা দিলে ঠিকাদার ও শ্রমিকদের হত্যা করে লাশ তিস্তা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় আসামিরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ঘটনায় অভিযুক্ত আসামিরা মূলত বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে এলাকায় “আগুন খাওয়া পার্টি” নামে পরিচিত ছিল। সেই সময়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি ও নানা অপকর্মের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল তারা। সরকার পতনের পর মাঝখানে কিছুদিন কৌশলগত কারণে তারা গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও, পরিস্থিতি একটু ঠাণ্ডা হতেই আবারো প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসেছে। এখন তারা একই কায়দায় আগের মতোই প্রকাশ্য দিবালোকে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
আগে যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মানুষের ওপর জুলুম করত, এখন তারাই তিস্তাপাড়ের অসহায় মানুষের বাঁচার শেষ অবলম্বনটুকু কেড়ে নিতে মেতে উঠেছে।
বর্ষার এই উত্তাল সময়ে বাঁধের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ। একদিকে সর্বনাশা তিস্তার গর্জন, অন্যদিকে এই সন্ত্রাসী চক্রের জুলুম, দুই মিলে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ। এই বাঁধটি যথাসময়ে শেষ করা না গেলে তিস্তার তীব্র ভাঙনে বিলীন হয়ে যাবে ফসলি জমি আর শেষ সম্বল বসতভিটা। মানুষের এই জীবন-মরণের লড়াইকে জিম্মি করে নিজেদের পকেট ভারী করতে নেমেছে বাবু, নাসির, ইনসান ও লেবু মিয়ার মতো কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ঠিকাদার মোঃ আজম আলী বাদী হয়ে ৫ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৩৫-৪০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে ডিমলা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযুক্ত প্রধান আসামিরা হলেন,মোঃ বাবু (৪৫) মোঃ ইমরান আলী (৪০) মোঃ লেবু মিয়া (৫২) মোঃ অহিদুজ্জামান (৪৮) মোঃ হাবিবুর রহমান (৩৫)
ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শওকত আলী সরকার জানান, অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং নদী রক্ষা বাঁধের স্বার্থে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নদীর করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে তিস্তাপাড়ের ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের এখন একটাই আকুতি অবিলম্বে যেন এই “আগুন খাওয়া” চক্রটিকে দমন করে বাঁধের কাজ পুনরায় শুরু করা হয়। তা না হলে নদী হয়তো কেড়ে নেবে তাদের শেষ আশ্রয়টুকুও।