শিক্ষকতার আড়ালে অবৈধ অনলাইন জুয়া, চাকরী ও বিদেশ যাবার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার তবকপুর আবু বক্কর সিদ্দিক ফাজিল মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন আইনী পদক্ষেপ নিলেও উদ্ধার হচ্ছে না খোয়া যাওয়া টাকা।
অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যপক অনুসন্ধান করে জানা গেছে, সহকারী অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম মাদরাসায় চাকুরী করলেও মূলত: বিভিন্ন প্রতারণামূলক কাজে জড়িত। এসব থেকে তার আয় লক্ষ লক্ষ টাকা। কিন্তু প্রতারণার শিকার পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মারাত্মকভাবে। তার নামে ঢাকা সিএমএম আদালতে চুরি, হুমকি, বিশ্বাসভঙ ও প্রতারণার একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলার খবর গোপন রেখে তিনি হরহামেশাই চালিয়ে যাচ্ছেন তার অবৈধসব কর্মকান্ড। একজন মাদরাসা শিক্ষক হয়ে অবৈধ ডলার ব্যবসা, অনলাইন জুয়াসহ প্রতারণার নানা কর্মকান্ডে জেলা জুড়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়।
শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় যুক্ত থাকা সত্ত্বেও নজরুল ইসলাম বিভিন্ন ধরনের অনলাইন জুয়া, ডলার লেনদেনভিত্তিক অবৈধ বিনিয়োগ ও প্রতারণামূলক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকেই সম্পৃক্ত। বিদেশ থেকে পরিচালিত কয়েকটি অবৈধ অনলাইন কোম্পানির নামে দুই মাস, ছয় মাস ও এক বছরে দ্বিগুণ-তিনগুণ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগে জানা গেছে। ভুক্তভোগী মানুষজনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী ডিজিটাল ইনভেস্ট সলিউশন, এএফসি কয়েন, পিএলসি, এমটিএফই, কস প্ল্যাটফর্ম, সিসি মাইনিং, অপটিমাস, ইজিট্রেড, ডিএফএম এবং ওএম বাজারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিনিয়োগের কথা বলে টাকা সংগ্রহ করেন নজরুল ইসলাম। এছাড়া বর্তমানে ‘ ডিএফএম’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওমরাহ হজ্ব পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা বাবুল হোসেন জানান, স্বামী স্ত্রী দুজনে ওমরা হজ্ব করার জন্য উলিপুরের নজরুলকে ১২ লক্ষের উপরে টাকা দিয়েছি। এই টাকা থেকে লভ্যাংশ প্রদানসহ আমাদের ওমরাহ হজ্ব করানোর কথা ছিল। কিন্ত এখন তিনি কোনো টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। একইভাবে ওই নজরুল ইসলাম কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার শিক্ষক ইলিয়াস আলীকেও ১২ লক্ষ টাকার উপরের মূল্যমানের ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে ওমরা হজের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ইলিয়াস আলী অন্যান্যদের সাথে কথা বলে প্রতারণার সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছেন এবং নজরুলকে টাকা দেন নি বলে জানান।
অভিযুক্ত নজরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী মাইদুল ইসলাম ও আরিফ হোসেনসহ উলিপুর উপজেলার আকবর আলী, আক্কাস আলী, লাভলু মিয়া, মিনহাজ উদ্দিন, রুবেল হোসেন এবং কুড়িগ্রামের শামীম হোসেন শিমুসহ অনেক ব্যক্তি জানিয়েছেন নজরুল ইসলামের খপ্পড়ে পড়ে তারা লাভের আশায় অর্থ লগ্নী করেন। কিন্তু তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক লাভ দূরের কথা এখন আসল টাকা খোয়া যাবার পথে। তারা নজরুলের কাছে বিভিন্নভাবে দেনদরবার করে টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। ফলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তারা বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক তার ব্যক্তিগত অ্যান্ড্রয়েড ফোনে বাইন্যান্স ও ট্রাস্ট ওয়ালেট ব্যবহার করে নিয়মিত হাজার হাজার ডলার ক্রয়-বিক্রয় করেন যা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এছাড়াও বগুড়া জেলা বাসিন্দা নুর আলম সিদ্দিকের কাছ থেকে বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে লক্ষ লক্ষ টাকা এবং ঢাকার রামপুরার বাসিন্দা সাদিয়া সুলতানা তৃষার কাছ থেকে ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা নিয়েছেন। ভুক্তভোগী নুর আলম জানান, অনেক দিনের জানাশোনা মানুষ হিসেবে বিশ্বাস অর্জন করে কুড়িগ্রাম উলিপুরের নজরুল ইসলাম আমার নিকট থেকে কয়েক ধাপে মোট ২৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। এখন বিদেশ পাঠানোর কোনো নামগন্ধ নেই। উল্টো আমাকে হুমকি ধামকি দিচ্ছেন। এ নিয়ে তাকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছি। ঢাকা রামপুরার সাদিয়া সুলতানা জানান, ব্যাংকে চাকরী দেবার কথা বলে পূর্ব পরিচিত উলিপুরের নজরুল ইসলাম ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন। চাকরী হয় নি। কিন্তু টাকা ফেরত দিচ্ছেন না তিনি। এ কারণে টাকা ফেরত চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছি।
অভিযুক্ত শিক্ষক নজরুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেয়ে মুঠোফোনে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তথ্য প্রমাণসহ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করা হলে তিনি স্বীকার করে বলেন, বিভিন্ন ব্যবসায় আর্থিকভাবে অনেকের সাথে যুক্ত আছি। আমি বর্তমানে রংপুরে আছি। এসব বিষয় নিয়ে পরে আপনার সাথে সাক্ষাতে কথা হবে।
প্রধান সম্পাদক: হুমায়ুন কবির রনি
মোবাইল: ০১৭১৬-৫৩০৫১৪
ইমেইল: onnews24@gmail.com
www.onnews24.com