কুড়িগ্রামে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের তৎপরতা, কমছে কৃষকদের উদ্বেগ

শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

কুড়িগ্রাম জেলায় সারের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সৃষ্ট সাময়িক অস্থিরতা নিরসনে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিজিবি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযান, মজুতকৃত সার উদ্ধার, ডিলার পর্যায়ে তদারকি এবং সমন্বিতভাবে সার বিতরণের উদ্যোগে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। এতে কৃষকদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জেলায় সারের প্রকৃত কোনো সংকট নেই। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার একসঙ্গে কেনা ও মজুদের প্রবণতা এবং সারের সংকট নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে কোথাও কোথাও সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে সার মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মজুত করা সার উদ্ধার করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিলারদের সার বিতরণ কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে, যাতে প্রকৃত কৃষকেরা নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সার পান।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারীর বিভিন্ন সার ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের উপস্থিতি বেড়েছে। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সারি ও সাময়িক উত্তেজনা দেখা দিলেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং নিয়ম মেনে সার বিতরণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন।

রৌমারী উপজেলায় সার বিতরণকে কেন্দ্র করে একটি ডিলার পয়েন্টে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। উপজেলার মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় মেসার্স মিতা-হাসান এন্টারপ্রাইজের ডিলার পয়েন্টে সকাল থেকে বিপুলসংখ্যক কৃষক সার নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। একপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়।

ডিলার মতিয়ার রহমান জানান, তাঁর গুদামে ৭৫০ বস্তা সার মজুত ছিল। প্রায় এক হাজার কৃষক সার নিতে লাইনে দাঁড়ানোয় চাপ তৈরি হয়। পরে পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে গুদামে থাকা সার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম বসুনিয়া বলেন, উপজেলায় সারের সংকট নেই। কৃষকদের ধৈর্য ধরে পর্যায়ক্রমে সার উত্তোলনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক রাখতে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে সারের সংকট নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিও কমে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুবুল হাসান বলেন, তিনি নিজে বিভিন্ন সার ডিলার পয়েন্ট পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কৃষকেরা যাতে নিয়ম মেনে সার পান, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন। একটি বিক্রয়কেন্দ্রে সাময়িক বিশৃঙ্খলা হলেও প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এদিকে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় সার বিতরণের স্লিপ দেওয়া নিয়ে সোমবার সকালে সাময়িক উত্তেজনা দেখা দেয়। উপজেলার বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের ব্রিজপাড় এলাকায় কয়েকজন কৃষক বাঁশ ফেলে ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে ভূরুঙ্গামারী–সোনাহাট স্থলবন্দর সড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রকৃত কৃষকদের নিয়ম মেনে সার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয় এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএডিসি ডিলার মেসার্স আফি সার ঘরের আওতায় ২৩৫ বস্তা ডিএপি ও ৯৫ বস্তা টিএসপি সার বিতরণের জন্য স্লিপ দেওয়ার কার্যক্রম চলছিল। এ সময় কৃষকদের মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা দেখা দেয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হাবিব, ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজিম উদ্দিন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেব নাথ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেক ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কুড়িগ্রামে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। রোপা আমন মৌসুমের প্রয়োজনের পাশাপাশি আগাম ভুট্টা, আলু ও বেগুন চাষের জন্য কিছু কৃষক অতিরিক্ত সার কিনে রাখার চেষ্টা করায় কোথাও কোথাও সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রোপা আমন ধানে ইউরিয়া সার প্রয়োগের নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইউরিয়া সার একসঙ্গে কেনা বা মজুদ না করে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সার কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের গুজবে কান না দিয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ডিলার বা ব্যবসায়ী নির্ধারিত নিয়মের বাইরে সার বিক্রি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা অবৈধভাবে মজুদ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি, অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং ডিলার পর্যায়ে সমন্বিতভাবে সার বিতরণের ফলে জেলার সার পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসছে। চলতি রোপা আমন মৌসুমে কৃষকের প্রয়োজনীয় সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যাপারেও আশাবাদী কৃষি বিভাগ।

আরো দেখুনঃ