চৌদ্দগ্রাম থানায় গাঁজা কান্ড, আস্থা হারাচ্ছে স্থানীয়রা
আহসানুজ্জামান সোহেল, কুমিল্লা

৭৬ কেজি গাঁজা উদ্ধারের দাবি, এজাহারে ১৬, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায় মাদকবিরোধী অভিযানে গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশের এজাহার, জব্দ তালিকা ও মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে বড় রকমের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। আবারো মাদককান্ডে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ। বার বার গাজাঁ কান্ডে চৌদ্দগ্রাম থানার প্রতি অসন্তোষ।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায় উদ্ধার করা মাদক আত্মসাৎ ও অর্থের বিনিময়ে আসামিদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট চৌদ্দগ্রাম থানার কালিকাপুর ইউনিয়নের বদরপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১০০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করেছিল।
মামলার এজাহার, জব্দ তালিকা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের মাঝে বিপুল পরিমাণের (প্রায় ৮০ কেজি) পার্থক্য থাকায় পুলিশের বিরুদ্ধে উদ্ধারকৃত গাঁজা আত্মসাতের অভিযোগ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
উদ্ধার করা ৮০ কেজি গাঁজা আত্মসাতের অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) লিটন চাকমার বিরুদ্ধে ৭৬ কেজি গাঁজা উদ্ধারের পর গাজার একটি বড় অংশ আত্মসাৎ এবং অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ওইদিন সকালে একটি ১৩-৫৯৭৬ নাম্বার এর নোহা গাড়িতে করে পুলিশের একটি টিম ধাওয়া দিয়ে সিতলিয়া রাস্তার মাথা এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যান আটক করেন এসআই লিটন চাকমা। পরে কাভার্ড ভ্যানে তল্লাশি চালিয়ে গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
সূত্রগুলোর দাবি, কাভার্ড ভ্যান থেকে প্রতিটি প্রায় দুই কেজি ওজনের ৩৮টি পোটলায় মোট ৭৬ কেজি গাঁজা পাওয়া যায়। এ সময় কাভার্ড ভ্যানের চালক ও সহযোগীকেও আটক করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কাভার্ড ভ্যান, চালক ও সহযোগীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উদ্ধার করা গাঁজার বড় একটি অংশও থানায় জমা না দিয়ে সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে এসআই লিটন চাকমার বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে এসআই লিটন চাকমা বাদী হয়ে ১৬ কেজি গাঁজা উদ্ধার ও জব্দের ঘটনায় একটি এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে ঘটনাস্থল হিসেবে নোয়াবাজার মহাসড়কের পাশের এলাকা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি বস্তায় করে ১৬ কেজি গাঁজা ফেলে পালিয়ে যায় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ওইদিন সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে সিতলিয়া রাস্তার মাথা এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যান আটকের পর তাতে তল্লাশি চালানো হয়। অর্থাৎ আটকের সময়, স্থান, যানবাহন এবং মাদক উদ্ধারের ধরন—সব ক্ষেত্রেই এজাহারে উল্লেখিত তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্যের পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এজাহারে উল্লেখ করা সাক্ষীদের নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এজাহারে উপস্থিত সাক্ষী হিসেবে যাদের নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, ওই ঠিকানায় গিয়ে তাদের পরিচয় বা উপস্থিতির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গোপন সূত্রের বরাতে আরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। সূত্রের দাবি, উদ্ধার হওয়া ৩৮টি পোটলায় থাকা ৭৬ কেজি গাঁজার মধ্যে প্রায় ৬০ কেজি গাঁজা একটি মাদক কারবারির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এর বিনিময়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
সূত্রটি আরও দাবি করেছে, ওই অর্থের একটি অংশ থেকে ৬০ হাজার টাকা ‘সোর্স মানি’ হিসেবে দেওয়া হয়। তবে সোর্স মানির পরিমাণ নিয়ে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সোর্সের সঙ্গে এসআই লিটন চাকমার বিরোধ তৈরি হয় বলেও সূত্রের দাবি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী জব্দকৃত মাদক আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ, আদালতের আদেশ অনুযায়ী নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে তার যথাযথ বিবরণ থাকার কথা। ২০২৬ সালের সংশোধনসহ প্রচলিত আইনে জব্দকৃত মাদক ও আলামত সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
এ কারণে ২৫ সেপ্টেম্বরের কথিত অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কত কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়েছিল, কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, কারা আটক হয়েছিল, উদ্ধার করা মাদক কোথায় সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং এজাহারে ১৬ কেজি গাঁজা উল্লেখের কারণ কী? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে এসআই লিটন চাকমার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাদক কারবারীরা হঠাৎ করে পুলিশের গাড়ি দেখে গাজাঁর ৪টি থলে ফেলে চলে যায়। কাভার ভ্যান চালকের কাছ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা গ্রহনের বিষয়টি জানতে চাইলে প্রথমে তিনি এড়িয়ে যেতে চাইলেও পরে চালকের ঠিকানা জানতে চান এবং পরর্বতীতে তিনি বিষয়টিকে নিয়ে বিব্রত বোধ করেন।