দীঘিনালায় নারী সমাবেশ ও র্যালি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলসহ সর্বত্র নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে : নীতি চাকমা
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

পাহাড়ে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের আপোষহীন নরাী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা বলেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ সারাদেশে নারী ও শিশুরা অনিরাপদ, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা মধ্যে দিয় দৈনন্দিন জীবন যাপন করছে। দেশের প্রতিনিয়ত নারীর ওপর সহিংসতা এবং কোথাও না কোথাও খুন, ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ ঘটনা ঘটছে। কাজেই এসব বন্ধ এবং রোধ করতে হলে সকলকে ঐকবদ্ধ হয়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
এসময় তিনি, ক্ষেত-খামার, হাটবাজার,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থল থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট কিংবা নদীঘাট-সর্বত্র নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ১০:৩০ টায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বাবুছড়া মাঠে অনুষ্ঠিত নারী সমাবেশে বক্তব্য প্রদানের সময় তিনি এসব কথা বলেন।
নারী সমাবেশটি উদ্বোধন করেন ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে খাগড়াছড়িতে সেনা সদস্যদের গুলিতে নিহত শহীদ জুনান চাকমার মা রূপসা চাকমা।
তিনি তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, আজ থেকে দুই বছর আগে আমার ছেলে জুনানকে খাগড়াছড়ি সদর স্বনির্ভর এলাকায় সেনাবাহিনী সদস্যরা গুলি করে হত্যা করেছিল। আমরা সরকারের নিকট জুনান হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার চেয়েছিলাম, কিন্তু আজ দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে সরকার এখনো জুনান চাকমার হত্যার বিচার করেনি। এই বছর জুনান হত্যা দিবসে পারিবারিকভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান সহ তাঁর স্মৃতিস্তম্ভর উদ্বোধন করা হবে। সেখানে উপস্থিত থাকার জন্য সর্বস্তরে জনসাধারণকে তিনি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আজকে এই নারী সমাবেশ আপনাদের উপস্থিত দেখে আমি খুশি হয়েছি এবং এই সমাবেশ শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।
সমাবেশ উদ্বোধনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রথম শহীদ ভরদ্বাজ মুনি চাকমা-সহ সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
এরপর হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা বর্তমান পরিস্থিতি আলোকে গতকাল সংগঠনের বিশেষ সম্মেলনের গৃহীত ৭ দফা রাজনৈতিক প্রস্তাবনা সমাবেশে সমাবেত সকলের সামনে পড়ে শোনান। এসময় উপস্থিত ১৫শ’র অধিক নারী, শিক্ষার্থী ও জনতা হাত উঁচিযে তা সমর্থন জানান।
সমাবেশে নারীনেত্রী নীতি চাকমা বলেন, পাহাড়ে নারী নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হচ্ছে সেনা ও সেটলার। পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পূর্ব শর্ত হচ্ছে পাহাড় থেকে “অপারেশন উত্তরণ” ও “অবৈধ ১১দফা নির্দেশনা” প্রত্যাহার করে সেনা-সেটলার ফিরিয়ে নেওয়া। তার পরিবর্তে সেনা, গোয়েন্দা, আমলা ও সরকারের অনুগ্রহভাজন কতিপয় ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে সরকার কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে উদ্যত হয়েছে, তা গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপি’র অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সেনা ও আমলা নির্ভর উদ্যোগ ফলপ্রসু হবে না বলে আমরা মনে করছি।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক সমস্যা। রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। “সন্ত্রাস” ও “বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন”, “সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ”Ñইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার হচ্ছে প্রকৃত সমস্যা আড়াল করার লক্ষ্যে গণবিরোধী স্বৈরশাসকের চিরচেনা কৌশল। তাতে সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হবে ।
তিনি বলেন, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লড়াই সংগ্রাম সংগঠিত করছে এবং এ লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের রাজনৈতিক অধিকার অর্জিত হলে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাস্তব শর্ত তৈরি হবে মন্তব্য করেন।
সামা হক বলেন, অনেকেই বলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কিন্তু একটি প্রজাতন্ত্র দেশে প্রতিনিয়ত আর্মি, পুলিশ, সেটলার কিংবা মুখোশ, ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী দ্বারা ইউপিডিএফ’র অথবা জনগণের আন্দোলনের বাধাগ্রস্ত করতে পারে? একটি স্বাধীন দেশে তা হয় না বা হতে পারে না।
তিনি বলেন, ইতিহাসে বিপুল, জুনান, কল্পনা চাকমার মতো ঘটনা আমরা আর চাই না। আমরা আমাদের আরো কোন ভাই, সন্তান, বোন, পিছি কাউকে হারতে চাই না। এই রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে শ্রমিক, জনগণের ক্ষমতা, জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তখনি এই রাষ্ট্রের নিপীড়ন বন্ধ হবে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী আমাদের রক্ষা করবে ।
ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেন, বিএনপি সরকার মীর হেলালকে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগণের ভোটের নির্বাচিত না হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে দায়িত্ব দিয়ে সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানে পায়ে শিকল বেঁধে দিয়েছিল। ফলে সরকার গঠনের ৩ মাসের মধ্যে দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। সরকার বর্তমানেও মীর হেলালকে পাহাড়ে উন্নয়ন, শান্তি, শৃঙ্খলা, তদারকির দায়িত্বও প্রদান করেছে। এসব মূল কারণ হচ্ছে পাহাড়িদের ধ্বংস করা। বর্তমানে আমরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছি, সেটলাররা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয়েছে। তিনি, নিজেদের বাঁচার তাগিদে আন্দোলন সংগ্রামে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
নারী সমাবেশে একাত্মতা জানিয়ে রেড ফেমেনিস্ট ব্লক সদস্য নাওশিন ফ্লোরা বলেন, “দশকের পর দশক ধরে পাহাড়ে সংঘাত ও সামরিকীকরণের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুরা যৌন সহিংসতা, ভয়ভীতি, উচ্ছেদ এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেক সময় সহিংসতার পর এসেছে আরেকটি অন্যায়-নীরবতা, ভুক্তভোগীদের ওপর চাপ, তদন্তের ব্যর্থতা এবং দায়মুক্তি।”
পাহাড়-সমতলে নারী নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “সেনা শাসন পাহাড়ের নারীদের নিরাপত্তা কথা বলে তাদের নিজের জন্মভূমিতে অবরুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু সেনাবাহিনী নিজেরাই এদের ওপর নিপীড়ন করে। অপরদিকে বাঙালি সেটেলার আদিবাসিদের নিজস্ব জায়গায় এসে সেনা সহায়তায় তারা আদিবাসী নারীদের উপর অন্যায়, নির্যাতন চালায়। এছাড়াও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা এই দেশে সংখ্যালঘু পাহাড়ি নারীদের নিজস্ব কালচার ধারণ করাটাও বিরুপ চোখে দেখে। ফলে পাহাড়ি নারীদের যে নিজস্ব সকীয়তা তা অনেক সময়েই তাদের লুকিয়ে রাখতে হয়।”
তিনি আরো বলেন, “আমরা সকলেই বাংলাদেশের নাগরিক এবং সেই কারণেই পাহাড়ি নারীদের উপর করা নিপীড়ন এর প্রতিবাদ জানাতে হবে এবং পাহাড়ি নারীদের মুক্তি তখনই হবে যখন পাহাড়ি নারীদের নিজেদের জন্মভূমিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।”
সমাবেশে কণিকা দেওয়ান বলেন, নিরাপত্তার নামে নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্ত পরিস্থিতিকে অশান্ত করছে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তিন কমিটি গঠনও তারই অংশ। কাজেই সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থেকে সকল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তিনি, সেনা শাসনের নিপাত হবে ও পাহাড়ে আদিবাসী নারী অধিকারসহ পূর্ণস্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়িত হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বাবুছড়া ইউপি চেয়ারম্যান গগণ বিকাশ চাকমা বলেন, পাহাড়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি একদিন নিরসন ঘটবে। আমাদেরকে টিকে থাকার জন্য এক ও অভিন্ন হয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
সমাবেশে ছাত্রনেতা সমর চাকমা বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে দমন-পীড়নে করতে নতুন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অগণতান্ত্রিক নীতি কৌশল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, দমন-পীড়ন, হত্যা চালিয়ে জনগণের আন্দোলনকে ধ্বংস করা যাবে না। পাহাড়ি জনগণ অধিকারের জন্য লড়াই করছে, আত্মবলিদান দিয়েছেন। সুতরাং ভয় দেখিয়ে আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
“পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন” এই আহ্বানে এবং “ক্ষেত-খামার,হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থল থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট কিংবা নদীঘাট-সর্বত্র নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে” অনুষ্ঠিত নারী সমাবেশে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন লেমপোস্টের গণমুক্তির গানের দলের সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য ফারহানা হক সামা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি কণিকা দেওয়ান, রেড ফেিিমনস্ট ব্লত-এর সদস্য নওসিন ফ্লোরা, ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা, ৫নং বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গগণ বিকাশ চাকমা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর সভাপতি সমর চাকমা। এসময় উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য অনুপম চাকমা, জনপ্রতিনিধি প্রতিভা চাকমা, শান্ত চাকমা প্রমুখ।
সমাবেশ শেষে প্রতিবাদী গানের নৃত্য পরিবেশন করা হয়। এরপর একটি র্যালি বের করা হয়। বিভিন্ন প্রতিবাদী শ্লোগানে র্যালিটি বাবুছড়া প্রধান সড়কের নুয়ো পাড়ায় গিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়।