পঞ্চগড়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে যখন জেলা ও উপজেলায় জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছিল, ঠিক তখন গত কাল ১৬ আগষ্ট অন্যদিকে নদীতে বিষ প্রয়োগ করে চলছিল মাছ নিধন।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা সর্ববৃহৎ নদী করতোয়ায় ক্রমাগত বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধন করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক ও জাতীয় মৎস্য সম্পদ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গত এক মাসে উপজেলার ভজনপুর ও দেবনগড় ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদীতে অন্তত চারবার বিষ ঢেলে মাছ নিধনের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় মৎস্যজীবীদের ধারণা—গ্যাস ট্যাবলেট, চা বাগানে ব্যবহৃত বিষাক্ত কীটনাশক কিংবা উজান থেকে ভারতীয় সীমান্তে বিষ প্রয়োগ করে এই নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। বিষক্রিয়ার ফলে নদীর একটি অভয়াশ্রম সহ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছোট-বড় সব ধরনের জলজ প্রাণি ও মাছ মরে ভেসে উঠছে। প্রাণ বাঁচাতে নদীর মাছ পানি থেকে লাফিয়ে ডাঙায় উঠে আসার হৃদয়বিদারক দৃশ্যও দেখা গেছে।
নদী ও মৎস্য অভয়াশ্রমে বিষ প্রয়োগের মতো গুরুতর অপরাধের খবর পেলে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন, মৎস্য আইনে মামলা দায়ের, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং অভয়াশ্রম পুনর্গঠনে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আইনগত বিধান রয়েছে। অথচ তেঁতুলিয়া উপজেলা ও পঞ্চগড় জেলা মৎস্য কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়েনি।
একের পর এক বিষ প্রয়োগের ঘটনায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নদীনির্ভর অসংখ্য মৎস্যজীবী বেকার হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে এখন আর দেখা মিলছে না নদীর সুস্বাদু দেশি মাছের।
অভিযোগ উঠেছে, জেলা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের চরম উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতকারীরা বারবার মাছ নিধনে উৎসাহিত হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উদাসীনতা ও অসাধু কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থেকে সময় পার করছেন। প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম জনবিচ্ছিন্নতার কারণে সাধারণ মানুষ মৎস্য বিভাগের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ। বছরের পর বছর ধরে একই ঘটনা ঘটে চললেও দপ্তরটি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
স্থানীয়দের একাংশের ধারণা, কিছুদিন আগে মৎস্য দপ্তরের এক অভিযানে অবৈধ জাল পুড়িয়ে দেওয়ার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে নদীতে বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটি অসাধু চক্রের প্রতিশোধমূলক কাজ, চা বাগানের কীটনাশকের প্রভাব, নাকি অন্য কোনো ষড়যন্ত্র—সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
করতোয়া নদীতে বিষক্রিয়ায় মৎস্য নিধনের ফলে নদীপার্শ্ববর্তী এলাকায় পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নদীটি এখন প্রায় মৎস্যশূন্য। কমে গেছে জলজ প্রাণীর বংশবৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি অতিথি পাখির আনাগোনা।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বিষাক্ত এই মরা মাছ সংগ্রহ করে নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা খাবার তালিকায় যুক্ত করছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিষাক্ত মাছ ভক্ষণের ফলে ক্যানসারসহ নানা জটিল ও প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। অথচ এই বিষাক্ত মাছ সংগ্রহ ও খাওয়া বন্ধে স্থানীয় বা জেলা উপজেলা প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো প্রচার বা উদ্যোগ দেখা যায়নি।
পরিস্থিতি বিচারে ভুক্তভোগী মৎস্যজীবী ও সচেতন মহল অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং করতোয়া নদী সুরক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে মৎস্য কর্মকর্তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রধান সম্পাদক: হুমায়ুন কবির রনি
মোবাইল: ০১৭১৬-৫৩০৫১৪
ইমেইল: onnews24@gmail.com
www.onnews24.com