কুড়িগ্রাম সদরের ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত যাত্রাপুর ইউনিয়নের একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপচর ‘ঝুনকার চর’। এই চরের শিক্ষার একমাত্র আলো ‘খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের চরম অনিয়ম আর দায়িত্বে অবহেলার কারণে স্কুলটির পাঠদান ব্যবস্থা প্রায় স্তব্ধ। সোমবার (১৭ আগস্ট) সেই অনিয়ম অতীতের সব সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। দিনভর তালাবদ্ধ ছিল বিদ্যালয়টি; শ্রেণিকক্ষের তালা খোলা হয়নি, এমনকি উত্তোলন করা হয়নি জাতীয় পতাকাও।
মঙ্গলবার থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন (২য় সাময়িকী) পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। পরীক্ষার আগের দিন সকাল থেকে প্রাতঃরাশ সেরে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে শুরু করে। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদের মধ্যে অপেক্ষা করেও কোনো শিক্ষকের দেখা মেলেনি। বেলা গড়িয়ে দুপুর হলে বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ দেখে ক্ষুব্ধ ও ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে শ্রেণিকক্ষের দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করে অবুঝ শিশুরা এবং চিৎকার করে প্রতিবাদ জানায়। নদীবেষ্টিত চরের বুকে শিশুদের এমন বিক্ষোভ দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তালাবদ্ধ থাকায় সরকার নির্ধারিত 'মিড ডে মিল' খাদ্যসামগ্রী বিতরণ থেকেও বঞ্চিত হয় শিশুরা।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে মোট চারজন শিক্ষক থাকলেও তাঁরা নিয়মিত আসেন না। শিক্ষকেরা নিজেদের সুবিধামতো দিন ভাগ করে সপ্তাহে দু-এক দিন হাজিরা দেন। তাঁদের মধ্যে একজন সহকারী শিক্ষক তো স্কুলে একেবারেই আসেন না বলে অভিযোগ। এমনকি বিদ্যালয়ে কোন হাজিরা খাতাও রাখা হয় না।
চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী চোখে জল নিয়ে বলে, “মঙ্গলবার থেকে আমাদের পরীক্ষা শুরু। নির্দেশনার জন্য স্কুলে এসেছি, অথচ আজ একজন শিক্ষকও আসলেন না,এভাবে অবহেলায় আমাদের পড়ালেখা আর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
স্কুলটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র আল-আমিন জানান, ২০১৬ সালে পুরোনো প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, “অনিয়মের বিষয়ে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। দুই সপ্তাহ আগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্তে এসে অভিযোগের সত্যতা পেলেও অদৃশ্য কারণে কোনো ব্যবস্থা নেননি।”
অভিযোগের বিষয়ে খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইশরাত জাহানের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন অবহেলা খুবই দুঃখজনক। কিছু শিক্ষকের কতিপয় কর্মকাণ্ডে সরকার এবং দল চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চরের শিশুদের ভবিষ্যতের সাথে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে হবে। ঘটনায় জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি। একই সাথে সকল স্কুলে নজরদারি বাড়ানোর জন্য শিক্ষা বিভাগের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোবাশ্বের আলী বলেন, “সোমবার কোনো শিক্ষক স্কুলে উপস্থিত ছিলেন না—এটি সত্য। দায়িত্ব অবহেলার কারণে সব শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ করা হচ্ছে।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী জানান, ঘটনা জানার পরপরই অভিযুক্ত সব শিক্ষককে শোকজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিধি অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রধান সম্পাদক: হুমায়ুন কবির রনি
মোবাইল: ০১৭১৬-৫৩০৫১৪
ইমেইল: onnews24@gmail.com
www.onnews24.com