বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৩২ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (১০ অক্টোবর)
নড়াইল প্রতিনিধি

আজ ১০ অক্টোবর, বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৩২ তম মৃত্যুবার্ষিকী । ১৯৯৪ সালের এই দিনে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে অসুস্থ্যতাজণিত কারনে অগণিত ভক্তদেরকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। পরে চিত্রপাড়ের সমুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা নিজ ভবনের উত্তর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই রঙ তুলির জাদুকরকে।
শিল্পী সুলতানের ৩২ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এসএম সুলতান ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে নানা কর্মসুচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসুচির মধ্যে রয়েছে কোরআন খতম, শিল্পীর মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন, দোয়া ও মোনাজাত, শিশুকিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা ও পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।
শিল্পী এসএম সুলতান ১৯২৪ সালের ১০ আগষ্ট নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তার বাবার নাম মেছের আলী ও মায়ের নাম মাজু বিবি। বাবা মা আদার করে এস এম সুলতানের নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া।সুলতা আর্থিক অভাব-অনটনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় বেশিদূর এগোতে পারেননি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পর তাঁর স্কুলজীবনের ইতি ঘটে। এরপর তিনি বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। তবে ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। বাবার সাথে রাজমিস্ত্রির কাজ করার পাশাপাশি তিনি দালানকোঠার ছবি আঁকা শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রায় তিন বছর চিত্রকলার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই তিনি বেরিয়ে পড়েন। শিল্পী সুলতান পাকিস্তান, কাশ্মীর ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। ভ্রমণ ও সাধনার মাধ্যমে নিজেকে একজন বিশ্বমানের চিত্রশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন।
জীবদ্দশায় কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ছবি প্রদর্শনী বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য রাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে তিনি এসব দেশে বেশ কয়েকটি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নেন। দেশের ভেতরে ঢাকা ও নড়াইলে তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এবং ১৯৮৭ সালে গ্যেটে ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীগুলো তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য ছিলো গ্রামীণ জীবন ও অতিবলিষ্ঠ পেশিবহুল কৃষকসমাজ। তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে চর দখল, ধান কাটা, পাট কাটা, কৃষকের সংগ্রাম ও আমার গ্রাম, উল্লেখযোগ্য। চিত্রশিল্পের মূল্যায়ন হিসেবে এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভুষিত হন। এছাড়াও দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হন।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর শিল্পী সুলতানের মৃত্যুর পর তার স্মৃতি সংরক্ষণে ২০০৩ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর স্মৃতি সংগ্রহশালা ও শিশুস্বর্গ তৈরি করা হয়। এছাড়া শিল্পীর নামে। একটি আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। শিশুস্বর্গে বর্তমানে সপ্তাহে ২দিন শিশুরা ছবি আঁকা শেখেন। কোমলমতি এসব শিশুরা শিল্পী এসএম সুলতানের মতো চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছবি আকা শিখছে। সুলতানের প্রতিষ্ঠিত শিশুস্বর্গে কাজ করতে পেরে খুশি শিক্ষকরাও।
এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় রয়েছে শিল্পীর আঁকা দুর্লভ কিছু ছবি ও তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র। শিল্পীর এসব চিত্রকর্ম ও তার বাসভবন দেখতে এবং সুলতান সম্পর্কে জানতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনাথীরা আসেন। চিত্রাপাশের সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা পরিবেশ দর্শনার্থীদের মন কেড়ে নেয়। তবে আয়তন বা পরিধি কম হওয়ায় দদর্শনার্থীরা আত্মতৃপ্তি না পেয়ে ফিরে যায়। আশেপাশের জমি অধিগ্রহণ করে সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালাকে একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করার দাবি দর্শনার্থীদের।
এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী জানান, সংগ্রহশালায় বর্তমানে শিল্পী সুলতানের ২৩টি দুর্ভল চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি রেপ্লিকা রয়েছে। শিল্পীর আরো চিত্রকর্ম থাকলেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। সংগ্রহশালাটি সম্প্রসারণে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে সংগ্রহশালার পরিধি বাড়বে এবং পর্যটনবান্ধব হয়ে উঠবে।