ভিন্ন রূপে হাজির তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আমাদের বুঝতে কত দেরি?
অনলাইন ডেস্ক।।

‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ শব্দবন্ধটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল সেনাবাহিনী, সামরিক জোট এবং পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দৃশ্য। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ আর বিশ শতকের যুদ্ধের সেই পরিচিত কাঠামো অনুসরণ করে না। এখনকার সংঘাতগুলো অনেক বেশি খণ্ডিত, বহুমাত্রিক এবং অর্থনীতি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত।
পশ্চিমা শক্তি ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর জোটের মধ্যে উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসছে–পৃথিবী কি ইতোমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, হয়ত শুধু তার রূপটাই ভিন্ন?
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তত দুটি বড় যুদ্ধক্ষেত্র বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।
প্রথমটি হলো রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, যা ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর থেকে এই সংঘাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে শত শত বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ফলে যুদ্ধটি কার্যত যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের সঙ্গে রাশিয়ার একটি পরোক্ষ বা প্রক্সি সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
দ্বিতীয় উদীয়মান ফ্রন্টটি হলো ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে ঘিরে বাড়তে থাকা সংঘাত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দেয়। তারা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল একপ্রকার বন্ধ করে দিয়েছে। এই সংঘাত ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা দিয়েছে। তেলের দাম বেড়েছে, খাদ্য ও সার সরবরাহ ব্যবস্থায়ও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিঘ্ন।
এই দুটি যুদ্ধ ভৌগোলিকভাবে আলাদা হলেও এতে জড়িত বৃহৎ শক্তিগুলোর অবস্থান ও জোটের কারণে এগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশ্ব রাজনীতিতে ধীরে ধীরে একটি ঢিলেঢালা কিন্তু স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক বিভাজন দেখা যাচ্ছে।
একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা, ন্যাটো সদস্য দেশ যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য রাষ্ট্র। এসব দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে ধীরে ধীরে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে উঠছে। এটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট না হলেও বিশ্লেষকেরা প্রায়ই একে একটি উদীয়মান ভূরাজনৈতিক ব্লক হিসেবে উল্লেখ করেন, যার প্রধান বন্ধন হলো পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা।
এই বাস্তবতায় অতীতের বড় বৈশ্বিক সংঘাতগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কিছু মিল চোখে পড়ে। যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লক, আদর্শিক প্রতিযোগিতা এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে, এই শক্তিগুলোর বেশিরভাগই এখনো সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলছে।
বর্তমান সময়ের সংঘাতকে অনেক গবেষক যে নামে অভিহিত করেন তা হলো ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’। এখানে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের বদলে প্রতিযোগিতা চলছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
প্রক্সি যুদ্ধ: রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, কিন্তু ন্যাটো দেশগুলো অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান সরাসরি হামলা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে মোকাবিলা করছে। তাদের নানাভাবে সাহায্য করছে রাশিয়া ও চীন।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ: নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি রাজনীতি এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রধান হাতিয়ার। ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার ওপর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ খুলে দিয়েছে, আর ইরানকে ঘিরে সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
প্রযুক্তি ও সাইবার সংঘাত: সাইবার হামলা, স্যাটেলাইট যোগাযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং তথ্যযুদ্ধ এখন ভূরাজনীতির নিয়মিত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, বড় শক্তিগুলো একাধিক ফ্রন্টে একই সময়ে পরোক্ষভাবে লড়াই করছে—যা কাঠামোগতভাবে বিশ্বযুদ্ধের মতো হলেও তার রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আধুনিক যুদ্ধ আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আর্থিক ব্যবস্থা, সবকিছুই এখন এক ধরনের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হুমকির মুখে পড়েছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি দামের বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। একই সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
এর প্রভাব কৃষিক্ষেত্রেও পড়ছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও পরিবহন নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটায় সার ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়েছে।
ফলাফল হলো, একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এসব হাইব্রিড যুদ্ধের অভিঘাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
কেন এটি এখনও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নয়
এই সব মিল থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে পূর্ণমাত্রার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি।
ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বযুদ্ধ বলতে বোঝায় বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না। একইভাবে চীন ও ন্যাটো বাহিনীর মধ্যেও কোনো খোলা যুদ্ধ চলছে না।
বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের অনুপস্থিতিই এখনও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলেনি।
এক নতুন ধরনের বৈশ্বিক সংঘাত
তবুও বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা একটি নতুন ‘কোল্ড ওয়ার’ বা ‘বহুমেরু সংঘাতের’ যুগে প্রবেশ করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট, তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনা, সাইবার যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিভাজন—এই সব সংকট ক্রমশ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
ঝুঁকিটি হয়তো হঠাৎ করে একটি বিশাল যুদ্ধ শুরু হওয়া নয়; বরং ধীরে ধীরে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে চলে যাওয়া, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাতগুলো একসময় বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে ওঠে।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এখন প্রশ্ন শুধু এই নয় যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে কি না। বরং পৃথিবী কি ইতোমধ্যেই তার প্রথম অধ্যায়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কি না সেটাই এখন মূল আলোচনার বিষয়।
সূত্রঃ channel24
আই/অননিউজ২৪।।