শিক্ষার্থীশূন্য মাদ্রাসায় জালিয়াতি ও দুর্নীতির মহোৎসব, মুখোমুখি শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদ
নিজস্ব প্রতিবেদক নীলফামারী।

নীলফামারী সদরের লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের লক্ষ্মীচাপ দরগাহবন্দ দারুস সুন্নাত (ডিএস) দাখিল মাদ্রাসায় একদিকে শিক্ষার্থী সংকট ও ভুয়া হাজিরার অভিযোগ, অন্যদিকে মাদ্রাসা সুপার ও পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, বেতন বিলে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব এবং শিক্ষক হয়রানির গুরুতর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে।
১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে এমপিওভুক্ত হওয়া এই প্রতিষ্ঠানে ১২ জন শিক্ষক ও ৫ জন কর্মচারীসহ মোট ১৭ জন কর্মরত রয়েছেন। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩২০ জন হলেও বাস্তবে শ্রেণীকক্ষগুলো একেবারেই শিক্ষার্থীশূন্য।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১০ম শ্রেণীতে কাগজে-কলমে ৪৩ জন শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও উপস্থিত ছিল মাত্র ৬ জন (৫ জন ছাত্র ও ১ জন ছাত্রী)। অথচ হাজিরা খাতায় মাসজুড়ে সমানে শতভাগ উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। এমনকি প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী (এবতেদায়ী শাখা) পর্যন্ত কোন শিক্ষার্থীর অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। শ্রেণীকক্ষের বেঞ্চগুলোতে জমেছে ধূলোবালুর স্তর। শিক্ষকরাও খোশগল্প করে সময় কাটাচ্ছেন।
সংকটজনক এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম ও দুর্নীতির থলি উন্মোচন করে জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর এক চাঞ্চল্যকর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ৪র্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক (বাংলা) হাসনাহেনা চৌধুরী।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মাদ্রাসার বর্তমান সভাপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদ্রাসা সুপার ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করছেন। শিক্ষককে মানসিক নির্যাতন ও বেতন বিলে সই না করে হয়রানি করা হচ্ছে।
বাস্তবে শিক্ষার্থী উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করে হাজিরা খাতায় ভুয়া উপস্থিতি দেখাতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সহিদার পরিচালিত অন্য একটি বেসরকারী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এই মাদ্রাসায় রেজিস্ট্রেশন করিয়ে জালিয়াতি করা হচ্ছে।
বই বিক্রির অবৈধ অর্থ লেনদেনসহ নতুন কর্মচারী নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের জালিয়াতির চেষ্টা করা হচ্ছে।
বর্তমান সুপার গত দুই বছর আগে পদোন্নতি পেলেও অজ্ঞাত কারণে এখনো সহ-সুপার পদেই এমপিও উত্তোলন করছেন, যা সরকারি বিধিমালার পরিপন্থী।
দাপ্তরিক সময় না মেনে ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান ত্যাগ এবং স্থানীয় অফিস সহকারী শরিফুল ইসলাম ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী সহিদার কর্তৃক শিক্ষকদের গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ও অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের এই বেহাল দশা এবং ভূতুড়ে হাজিরা নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক ও জমি দাতা রবিউল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষার মান না থাকায় অভিভাবকরা বাচ্চাদের অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন। বাস্তবে মাত্র ১৮-২০ জন শিক্ষার্থী আসা-যাওয়া করলেও হাজিরা খাতায় শতভাগ দেখানো হয়।
শিক্ষার্থী সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসা সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা মোঃ মাহমুদুল হাসান আফেন্দি জানান, পাশের সরকারি প্রাথমিকে বিস্কুটসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা থাকায় আমাদের শিক্ষার্থী কিছুটা কম। আগামী মাসে অভিভাবক সমাবেশ ডেকে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করা হবে। তবে আগাম ভুয়া হাজিরার বিষয়ে তিনি শ্রেণী শিক্ষকদের উপর দায় চাপান।
অভিযোগের বিষয়ে নীলফামারী সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এটিএম নুরুল আমীন শাহ্ জানান, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ হাফিজুর রহমান লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে জানান, “বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।