জামালপুরের ইসলামপুর পৌরসভার একটি উন্নয়ন প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রী ও সড়কবাতির দাম কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ ওঠার পর কার্য সহকারী বুলবুল আহমেদকে শাস্তিমূলক বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌরসভায় সংযুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় থেকে জারি করা এক আদেশে এ বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিচালক জন কেনেডি জাম্বিল স্বাক্ষরিত ওই আদেশের বিষয়টি বুধবার (৮ জুলাই) প্রকাশ্যে আসে।
এর আগে ইসলামপুর পৌরসভার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিবি) একটি প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে। অভিযোগে বলা হয়, স্বল্পমূল্যের ব্লক, সড়কবাতি ও ড্রেন স্ল্যাবের প্রকৃত মূল্যের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি ব্যয় দেখিয়ে প্রায় কোটি টাকার আর্থিক অসংগতি সৃষ্টি করা হয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৪টি উন্নয়ন প্যাকেজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে আলোচিত প্যাকেজে ৯টি ওয়ার্ডে ৬৭০টি সড়কবাতি ক্রয়, ১৪০ মিটার ড্রেন স্ল্যাব নির্মাণ এবং পলবান্ধা এলাকায় রাস্তা সংস্কার ও পুকুরপাড়ে ব্লক বসানোর জন্য প্রায় ২৫ লাখ টাকার বরাদ্দ ছিল।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে অভিযোগ ওঠে, যেখানে একটি ব্লকের বাজারমূল্য প্রায় ১৯০ টাকা, সেখানে হিসাবপত্রে প্রতিটি ব্লকের পেছনে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। একইভাবে ৬০ থেকে ১২০ টাকা মূল্যের একটি সড়কবাতির দাম দেখানো হয়েছে প্রায় ৯১০ টাকা।
স্থানীয় ঠিকাদার হাসান দাবি করেন, প্রকল্পে ব্যবহৃত ২৭৬টি ব্লকের বাজারমূল্য প্রায় ৫২ হাজার টাকা। সিমেন্ট, বালু ও শ্রমিক ব্যয়সহ পুরো কাজের খরচ এক লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সরকারি নথিতে এর বিপরীতে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে।
পৌরসভার একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ, প্রকল্পে দেখানো সব সড়কবাতি বাস্তবে কেনা হয়নি। অনেক এলাকায় পুরোনো বাতিই রয়ে গেছে, আবার কোথাও নতুন বাতি স্থাপনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অনেক এলাকায় নতুন সড়কবাতি লাগানো হয়নি।
ঝিলিক ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল্লাহ জানান, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ১২ ওয়াটের সড়কবাতি পাইকারি বাজারে ৬০ টাকায় পাওয়া যায়। উন্নত মানের একই ধরনের বাতির দামও ১২০ টাকার বেশি নয়।
অভিযোগ রয়েছে, ১৪০ মিটার ড্রেন স্ল্যাব নির্মাণেও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বসানোর সময়ই কয়েকটি স্ল্যাব ভেঙে যায়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, ব্লক, সড়কবাতি ও স্ল্যাব নির্মাণ—এই তিন খাতেই কয়েক লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে।
পৌরসভা প্রকৌশল শাখার তথ্য অনুযায়ী, এমএমসি-এমকেটি জয়েন্ট ভেঞ্চারের নামে কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়। লাইসেন্সধারী ঠিকাদার আলাল উদ্দিন এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠে, প্রকল্পের কাজ বাস্তবে পরিচালনা করেছেন পৌরসভার কার্য সহকারী বুলবুল আহমেদ, যিনি অন্যের ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন।
যদিও বুলবুল আহমেদ লাইসেন্স ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেন, তবে কাজে অনিয়ম হয়ে থাকলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে সহকারী প্রকৌশলী মোফাখখারুল ইসলাম দাবি করেন, কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
বদলির বিষয়ে বুলবুল আহমেদ বলেন, তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আদেশের কপি হাতে পাননি, তবে বিষয়টি শুনেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলির আদেশ কার্যকর হওয়া ঠেকাতে তিনি বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করছেন।
ইসলামপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হোসাইন বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা হয় এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রধান সম্পাদক: হুমায়ুন কবির রনি
মোবাইল: ০১৭১৬-৫৩০৫১৪
ইমেইল: onnews24@gmail.com
www.onnews24.com