রবিবার, অক্টোবর ২০ .
  • ৫ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রেমিটেন্স কণ্যাদের নিরাপত্তায় দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন (বিশেষ কলাম)

0

কাজী খোরশেদ আলম।।


আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তারা ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে দেশের গন্ডি পার হয়ে প্রবাসের মাটিতে নিয়মিত যুদ্ধ করছে। নিজের ভাগ্য বদল করতে স্বামী সন্তান ও পিতা-মাতা, ভাই-বোনকে ছেড়ে দূর-দূরান্তে প্রবাস ঘাটছে। দেশের মায়া ত্যাগ করে একান্ত ভাগ্যের উপর ভরসা করে পর দেশে নিজের শরীরে ঘাম ও রক্ত বিক্রয় করে অর্থ উপার্জন করছে। কত দুঃখ-কষ্ট বুকে চাপা রেখে গৃহকর্তা ও অফিসের কর্মকর্তাদের অসহ্য নির্যাতন সহ্য করে সংসারের চাহিদা মেটানোর জন্য অর্থ প্রেরণ করে থাকে।
পুরুষরা যেমন রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করে সে ক্ষেত্রে নারীরাও কোন অংশ কম নেই; তারাও জীবনে ঝুঁকি নিয়ে বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে চলছে। দেশের পোষাক শিল্পে যেমন নারীরা যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে তেমনি রেমিটেন্স বৃদ্ধিতেও তারা পিঁছিয়ে নেই। তবে তারা যেভাবে কঠোর পরিশ্রম করে দেশ ও জাতীর কল্যাণে কাজ করছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে কিন্ত তাদের বিপদে-আপদে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কিংবা দেশের কর্তাব্যক্তিরা সন্তুষ্টজনক ভূমিকা রাখছে না। সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যথাযথ ভাবে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখলে হয়তো রেমিটেন্স কণ্যাদের নির্যাতন ও হয়রানীর পরিমাণটা কিছুটা কম হতো। তাই তারা দেশে ও দেশের বাহিরে বিভিন্ন ভাবে হয়রানী ও নির্যাতনের শিকার হন। খুন,ধর্ষন,নির্যাতন,নিপিড়ন ও শারিরীক অত্যাচার যেন তাদের নিত্য সঙ্গী’তে পরিণত হয়েছে। পিতা-মাতা,আত্মীয়-স্বজন,স্বামী-সন্তানের সাথে দেশের অভ্যন্তরে থাকার পরেও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ও চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগতে হয়; এমনকি বিভিন্ন ভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের সম্মুখিন হতে হয়। সেখানে বিদেশের মাটিতে আত্মীয়-স্বজন ও অভিভাবক ছাড়া তারা কতটুকু নিরাপদে থাকতে পারবে। তাদের ইজ্জত-সম্মান কতটুকু রক্ষা করে প্রবাসের মাটিতে টিকে থাকতে পারবে। তা ছাড়া আমাদের দেশের যে সকল নারী কর্মীরা প্রবাসে গমন করে তাদের বেশির ভাগই থাকে অল্প শিক্ষিত ও মূর্খ। তারা গৃহস্থালী কাজে প্রবাসের বাড়ীতে সংযুক্ত হয়। গৃহকর্তা ও গৃহকর্তীর মন জয় করতে পারলে রক্ষা অন্যথায় বিভিন্ন কলা-কৌশলে নির্যাতনের শিকার হয়। নারী কর্মীদেরকে প্রবাসে গমনের পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিভাগের যাচাই-বাছাই করা উচিত-তাদেরকে প্রকৃত পক্ষে কোন কাজে নেওয়া হচ্ছে অথবা তাদেরকে সঠিক কাগজপত্র ও চুক্তিপত্র সহি স্বাক্ষর করে নেওয়া হচ্ছে কি-না। দালাল চক্রের সদস্যরা এদেশের সাধারণ নারী ও গরিব মেয়েদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অনেক সময় প্রবাসে বিক্রয় করে দেয় কিংবা খারাপ গৃহকর্তার হস্তগত করে দেয়। এতে করে সেই মেয়েটি অথবা নারীটি দিনের পর দিন যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়। কিন্ত প্রতিকার পাওয়ার কোন পথ খোলা থাকে না। তাই একান্ত বাধ্য হয়ে সকল নির্যাতন সহ্য করে। নির্যাতনের মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে গেলে অনেক সময় আত্মহত্যার পথ বেচে নেয় কিংবা গৃহকর্তা তাদেরকে হত্যা করে ফেলে। বাংলাদেশের নারী বলে বিচার প্রার্থী হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কতর্ব্য অবহেলায় নারী শ্রমিকটির শেষ পরিণতি হয় মৃত্যু।
জাতীয় পত্রিকার সূত্রে জানা যায়, ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গিয়ে নির্যাতিত সউদী প্রবাসী নারা কর্মীরা চিকিৎসা ও পায়নি। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার বিধাব কাবিরুন নাহার। সউদীতে তার মহিলা নিয়োকর্তা তিন তলা বিল্ডিং এর ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেয়। প্রায় তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সেইফ হোমে আশ্রয় নেয় পঙ্গু কাবিরুন নাহার। সে জানায় সেইফ হোমে আরো ২৪০ জন নির্যাতিত নারী রয়েছে। ঢাকার জুরাইনের সেতু বেগম,বগুড়ার মাসুদা, লালমনির হাটের শিরিনা বেগম, বি-বাড়ীয়ার রোজিনা বেগম,নাটোরের রেবেকা খাতুন, বরিশালের কুলসুম,সিলেটের জোৎ¯œা,গাজীপুরের নাসিমা বেগম। তাদের অভিযোগ সেইফ হোমে আসার পরেও তারা তেমন কোন সহযোগীতা পায় না বরং তাদের দেশ থেকে পাঠানো টাকা দূতাবাসের ড্রাইভার ও পিয়নরা আত্মসাৎ করে ফেলে।
অপর দিকে মুন্সিগঞ্জ সদরের জহুরা বেগম নিজের একমাত্র সন্তানকে একটু ভালোভাবে মানুষ করার আশায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যান তিনি। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মাথায় ২০১৮ সালের ১৩ মে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে সৌদি আরব থেকে খবর আসে, তবে বোনের সন্তান যেন শেষবার মায়ের মুখ দেখতে পারে তাই জোহরার মরদেহ ফেরাতে মাসের পর মাস বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন শামীম মিয়া। তার চেষ্টায় মৃত্যুর ৯ মাস পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জহুরার লাশ আসে দেশে।
শুধু জহুরা নয়, ২০১৮ সালে ১৭ জন বাংলাদেশি নারীর লাশ এসেছে; যারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। যারা ছিলেন দেশের রেমিটেন্স সৈনিক, একটু ভালো থাকার আশায় গিয়েছিলেন বিদেশে।
গত কয়েক বছরে বিদেশে নারীকর্মীদের মৃত্যুর হার যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে আত্মহত্যার সংখ্যাও। ২০১৬ সাল থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত এ সংখ্যা ৫৩ জন। বিষয়টি উদ্বেগজনক বলছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রবাসী দেখভাল বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে প্রবাসী নারীকর্মীদের আত্মহত্যা বাড়ছে বলে তেমন কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। যদিও তিন বছরের যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে সেটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের হিসাব।
তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে ৬০ নারী গৃহকর্মীর মরদেহ দেশে আসে। এদের মধ্যে ১৭ জন আত্মহত্যা করেন, ২০ জন স্ট্রোকে, দুর্ঘটনায় ১০ জন, স্বাভাবিকভাবে ৫ জন এবং অন্যান্য কারণে ৮ জনের মৃত্যু হয়।
বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মাত্র একজন নারীকর্মীর আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে তা বেড়ে ১২ জন, ২০১৮ সালে ২৩ জনে দাঁড়ায়।
দরিদ্র পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষের মৃত্যু তাদের জন্য নতুন বিভীষিকা নিয়ে হাজির হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, তারা আত্মহত্যা করেননি, বরং তাদের হত্যা করে আত্মহত্যা করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে শামসুন নাহার নামে আরেক নারী কর্মী আত্মহত্যা করেছেন তা মানতে রাজি নয় তার ছেলে একরামুল মোল্লা। একরামুলের যখন আট বছর বয়স তখন বাবাকে হারান। মা অনেক কষ্টে তাকে বড় করেন। ২০ বছরের একরামুলকে বিয়েও দেন। কিন্তু এনজিও থেকে নেয়া লোন পরিশোধ করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছিলেন যশোরের মণিরামপুরের শামসুন নাহার।
তাই প্রতিবেশীদের দেখাদেখি তিনিও পাড়ি জমান সৌদি আরবে। কিন্তু জহুরার মতো তিনিও কয়েক মাসের মাথায় সেখানে আত্মহত্যার করেন বলে বাড়িতে খবর আসে।
বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, প্রত্যেকটি শ্রমিক সুস্থভাবে বিদেশ যায়। তার প্রমাণ মেডিকেল ফিটনেস নিয়ে প্রবাসে গমন করে। নিশ্চয় সেখানে গিয়ে তারা এমন কোন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, যাতে তারা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। এ শ্রমিকদের দেখাশুনার জন্য সরকার কোন ব্যবস্থা করতে পারেনি। অথচ এস রেমিটেন্স যোদ্ধারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। রেমিট্যান্স দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নে সবার শীর্ষে রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বর্তমানে প্রায় ৯০ লাখের বেশি জনশক্তি বিশ্বের ১৫৭ টির অধিক দেশে কর্মরত আছেন। প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাদের সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রেমিটেন্স বৃদ্ধি করতে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈেিদশিক মুদ্রানীতি বিভাগের প্রতিবেদন সূত্রে পাওয়া যায়,চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স ১৬শ’ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২১ জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা ১ হাজার ৬০৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। প্রবাসী আয়ের এ পরিমাণ অতীতের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য থেকে আরও জানা যায়, ২০১৮ সালে ব্যাংকিং চ্যানেলে এক হাজার ৫৫৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০৪ কোটি ডলার বা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে এসেছিল এক হাজার ৩৫৩ কোটি ডলার। এর আগের বছর ২০১৬ সালে ছিল এক হাজার ৩৬১ কোটি ডলার। ২০১৫ সালে এসেছে এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। আর ২০১৪ সালে রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৯২ কোটি ডলার। আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর প্রবাসী বাংলাদেশিদের ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
যাদের ত্যাগ ও কঠোর শ্রমের বিনিময়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়। তাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনী যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নারী শ্রমিক যারা তারা যেন কর্মক্ষেত্রে হয়রানী ও নির্যাতনের শিকার না হয়। বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিক প্রেরণের পূর্বে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা অথবা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা সঠিক ভাবে প্রদানের শর্ত রেখে সঠিক পন্থায় চুক্তি সম্পাদন করার ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। যাদের ত্যাগ ও ঘাম আমাদের রুটি-রোজির ব্যবস্থা হয়: আমাদের জীবিকার যোগান হয়। তাদের সুবির্ধার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই রেমিটেন্স কণ্যাদের সোঁনালী দিবসের প্রতিক্ষায়-তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদানে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিদের সু-দৃষ্টি দেওয়ার প্রত্যাশা রইল।
লেখকঃ-
কাজী খোরশেদ আলম
সাধারণ সম্পাদক, বুড়িচং প্রেস ক্লাব,

বুড়িচং,কুমিল্লা। ০১৭৭৬৩৯১৭৪২

Share.

About Author

Leave A Reply