কুমিল্লায় “আপন আলোয়” আবৃত্তি সন্ধ্যা: নবীন কণ্ঠে কবিতার অনন্য মঞ্চায়ন
কুমিল্লা প্রতিনিধি

কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন প্রজন্মের আবৃত্তিশিল্পীদের উজ্জ্বল উপস্থিতি যেন এক নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে এলো শনিবার সন্ধ্যায়। ‘পরম্পরায়’-এর আয়োজনে নবীন শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত আবৃত্তি আসর “আপন আলোয়”-এর উদ্বোধনী পর্ব হয়ে উঠেছিল এক প্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী আয়োজন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইন্সটিটিউট, কুমিল্লা কেন্দ্রের মিলনায়তন এদিন পরিণত হয়েছিল কবিতার আবেগ, কণ্ঠশৈলী আর দর্শক-শ্রোতার মুগ্ধতায় ভরা এক সাংস্কৃতিক মঞ্চে।
সন্ধ্যা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মিলনায়তন ভরে ওঠে দর্শকদের উপস্থিতিতে। আর সেই পরিপূর্ণ পরিবেশে শুরু হয় নবীনদের কণ্ঠে কবিতার একটানা প্রবাহ। ‘পরম্পরায়’-এর নিয়মিত শিক্ষার্থী আরাধ্যা, প্রত্যাশা, নাফিজা, নবনীতা, বর্ণালী ও আদ্রিতা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নির্বাচিত কবিতার আবৃত্তি পরিবেশন করেন। তাদের কণ্ঠে ছিল সংযম, অনুভূতিতে ছিল গভীরতা, আর উপস্থাপনায় ছিল অনুশীলনের ছাপ—যা দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হয় পুরো সময়জুড়ে। প্রতিটি আবৃত্তি যেন শ্রোতাদের ভিন্ন ভিন্ন আবেগের ভেতর দিয়ে নিয়ে যায়, কখনো ভাবনায়, কখনো আবেগে, আবার কখনো প্রতিবাদের শক্তিতে।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় দেশবরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী কাজী মাহতাব সুমনের বক্তব্যের মাধ্যমে। তাঁর কথায় উঠে আসে আবৃত্তির চর্চা, শুদ্ধ উচ্চারণ এবং নতুন প্রজন্মকে নিয়ে আশাবাদের কথা। পরবর্তীতে উপস্থিত অতিথিরা সম্মিলিতভাবে আলো প্রজ্বালনের মাধ্যমে এই আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন, যা পুরো অনুষ্ঠানে এক আলোকিত প্রতীকী মাত্রা যোগ করে।
এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসক ডাঃ মোসলেহউদ্দীন আহমেদ, বাচিকশিল্পী ও ক্রীড়া সংগঠক বদরুল হুদা জেনু, আবৃত্তিশিল্পী সুলতানা দীপালি, সারোয়ার নাঈম, সংগঠক তপন সেন গুপ্ত, শাহেদুল ইসলাম পলাশ, মোঃ আল আমিনসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল নবীন শিল্পীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার পর্ব। “জোড়া শালিক” থেকে প্রকাশিত কাজী মাহতাব সুমনের সদ্য প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থ “আবৃত্তিতন্ত্র আবৃত্তিমন্ত্র” তুলে দেওয়া হয় তাদের হাতে। বইটি তুলে দেন কবি ও প্রকাশক হালিম আবদুল্লাহ। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ও প্রশিক্ষক রুমা নাথ, হুমায়ুন কবির, জিয়াউদ্দিন ঠাকুরসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ। এই পর্বটি শুধু সম্মাননার নয়, বরং জ্ঞানচর্চা ও আবৃত্তির গভীরতা অনুধাবনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আবৃত্তি পরিবেশনা শেষে দর্শক-শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া পর্বে উঠে আসে প্রশংসা ও অনুপ্রেরণার নানা কথা। আবৃত্তিশিল্পী সুমাইয়া তানিয়া, অভিভাবক প্রতিনিধি নীহারিকা দাস ও সুধা ভৌমিক তাঁদের বক্তব্যে নবীনদের প্রচেষ্টা ও দক্ষতার প্রশংসা করেন এবং এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন ‘পরম্পরায়’-এর শিক্ষার্থী এবং সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সোহম সরকার।
‘পরম্পরায়’-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “আপন আলোয়” কেবল একটি এককালীন আয়োজন নয়। প্রতি ঋতুতে ধারাবাহিকভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে নবপ্রজন্মের আবৃত্তিশিল্পীরা একটি সুসংগঠিত ও বিশুদ্ধ মঞ্চে নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করবে—এমন প্রত্যাশা আয়োজক ও দর্শক-শ্রোতা সবার।