কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে কিশোরীদের শিক্ষায় ফেরাতে ও বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করছে ফ্রেন্ডশিপ
শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি।

নদীভাঙন, দারিদ্র্য, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই বাল্যবিবাহ একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপের কারণে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হতো। ফলে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত অসংখ্য কিশোরী, বাড়ত মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি, সীমিত হয়ে যেত তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি দপ্তর, গণমাধ্যমকর্মী এবং কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগে এ পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ কমিটির সক্রিয়তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সম্পৃক্ততার ফলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
বেসরকারি এনজিও প্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডশিপ এর উদ্যোগে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর ও রৌমারী উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ১৪টি চর এলাকায় পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যাত্রাপুর ও ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের নয়টি চর, সাহেবের আলগা ইউনিয়নের তিনটি চর এবং চর বান্দবেড় ইউনিয়নের দুটি চর এলাকায় ধারাবাহিকভাবে সচেতনতামূলক ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নভিত্তিক বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সক্রিয় ভূমিকার ফলে ইতোমধ্যে ২৩টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সমাজকর্মী ও কমিউনিটি নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত এসব কমিটি সম্ভাব্য বাল্যবিবাহের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে, কাউন্সেলিং প্রদান করে এবং প্রয়োজন হলে প্রশাসনের সহায়তা নেয়।
প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে যাত্রাপুর ইউনিয়নে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১০৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরীর একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব কিশোরীর অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং তাদের পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে, যাতে কোনো কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার না হয়।
চরাঞ্চলের প্রতিটি এলাকায় গঠিত স্কুল ওয়াচ কমিটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতি মাসে অনুষ্ঠিত সভাগুলোতে সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার বাল্যবিবাহের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন, ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরীদের চিহ্নিত করেন এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এসব সভার মাধ্যমে বিদ্যালয়, পরিবার এবং কমিউনিটির মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠেছে।
শুধু কমিটি গঠনেই সীমাবদ্ধ না থেকে চরাঞ্চলে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন স্থানে বাল্যবিবাহবিরোধী সচেতনতামূলক বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এসব বিলবোর্ডে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব এবং আইনগত দিক তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি যুব সমাজকে সচেতনতা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সভা নিয়মিত আয়োজন এবং সভার কার্যবিবরণী সংরক্ষণে সহায়তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্কুল ওয়াচ কমিটির তথ্য ইউনিয়ন পর্যায়ের সভায় উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের কিশোর-কিশোরীদের বাস্তব পরিস্থিতি নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তুলে ধরা হচ্ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সম্পৃক্ততাও এ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশ পুলিশের সহযোগিতায় চরাঞ্চলে কমিউনিটি পুলিশিংভিত্তিক মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ ও পুলিশের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাল্যবিবাহের ঘটনা প্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া কুড়িগ্রাম ও উলিপুর থানা পুলিশের সদস্যদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। কর্মশালাগুলোতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন, ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরীদের সুরক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে পুলিশ ও কমিউনিটির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের চরাঞ্চল পরিদর্শনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চর এলাকায় গিয়ে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারি সেবাগুলো কীভাবে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এসব সফর সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দুর্গম চরবাসীর মধ্যে দূরত্ব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতনতা বৃদ্ধির আরেকটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে নাট্য প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। বাস্তব জীবনের গল্প ও অভিজ্ঞতার আলোকে মঞ্চস্থ এসব নাটকে বাল্যবিবাহের সামাজিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে এ পর্যন্ত ১৮টি নাট্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সাহসিকতার উদাহরণও তৈরি হয়েছে চরাঞ্চলে। গোলাপের খামার এলাকার ১৬ বছর বয়সী আদুরী আক্তারের বাল্যবিবাহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে আইনগত সচেতনতা ও পারিবারিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে বন্ধ করা সম্ভব হয়। বর্তমানে সে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাচ্ছে।
একইভাবে জগমোহন চরের ১৬ বছর বয়সী স্বপ্না খাতুন বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে এসে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রেখেছে। আর ১৫ বছর বয়সী নিলুফা আক্তার নূরীর ক্ষেত্রে বিয়ে নিবন্ধনের উদ্যোগ বন্ধ করে তাকে ঐনপুনরায় শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ১৬ বছর বয়সী মারুফা আক্তার নিজেই নিজের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে সে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অন্য কিশোরীদেরও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করছে।
গতকাল দিনব্যাপি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেয়ার আলগা চড়ে গিয়ে দেখা যায় বেসরকারি এনজিও প্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডশিপ কর্তৃক স্থাপন করা হয়েছে আইনি সহায়তা কেন্দ্র। সেখানে ফ্রেন্ডশিপ কমিউনিটি প্যারালিগাল একজন রয়েছেন জহুরুল ইসলাম। তার সাথে কথা বলে জানা যায় ওই দুর্গম চরে প্রায় সাড়ে তিনশো পরিবারের বসবাস। পড়ালেখা না জানা এই চরের লোকজনের ভরসার প্রতীক হয়ে নিরলস পরিশ্রম করছেন তিনি। কোথাও অল্প বয়সে ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার খবর পেলে ছুটে যান আর তাদের পরিবারকে নিয়ে সুপরামর্শ প্রদান করেন। সেই সাথে প্রকল্পের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় নানান রকম সহায়তা।
কথা হয় মোসাম্মৎ সাহিনা আক্তারের সাথে। তিনি জানালেন তার পরিবারে রয়েছে এক ছেলে এবং এক মেয়ে। এই দুর্গম চরের মধ্যে কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় ফ্রেন্ডশিপ কর্তৃক প্রতিষ্ঠা পাওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রথম শ্রেণীতে পড়ছে তার ছেলে। চর থেকে বাইরের হাইস্কুলে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে মেয়েকে রেখেছেন কুড়িগ্রাম শহরে। মেয়ে সেখানে কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ছে।
এছাড়াও কথা হয় স্থানীয় মাহবুব আলমের সাথে। তিনি পেশায় কৃষিকাজ এবং মাঝেমধ্যে নদীতে মাছ ধরার কাজ করেন। পরিবারের রয়েছে দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। ছোট ছেলের বয়স মাত্র চার বছর আর বড় ছেলে এখন শিশু শ্রেণীতে পড়ছে ফ্রেন্ডশিপ স্কুলে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন আমার মেয়েটা অনেক মেধাবী ছাত্রী ছিল। তার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু অষ্টম শ্রেণীর পর আর পড়াতে পারিনি। এখানে কোন হাই স্কুল না থাকায় নদী পারাপার হয়ে বাইরে হাই স্কুলে যেতে হয়। মনের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে তাছাড়া আমি গরিব মানুষ, অর্থের অভাবে সেভাবে পড়ালেখার খরচ যোগাতে না পেরে বিয়ে দিয়েছিলাম। মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পেরে অনেক খারাপ লাগছে আমার।
ফ্রেন্ডশিপের এরিয়া রিজিওনাল ম্যানেজার নাঈম কামরান জানান, আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে এই দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কল্যাণে কাজ করছি। এখানে কোন স্কুল না থাকায় বাল্যবিবাহের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। আমরা স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেটা এখন আর নাই। যদি কোথাও বাল্যবিবাহ সংঘটিত হওয়ার উপক্রম হয় তাহলে আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধি আছেন তারা তাদের বাড়িতে গিয়ে কাউন্সিলিং করার ব্যবস্থা করেন এবং আমাদের অফিস কর্তৃপক্ষকে অবগত করেন। প্রয়োজনে আমরা পুলিশিং সহযোগিতা এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সহযোগিতা নেই। আশা করি স্থানীয়দের সহযোগিতায় আগামীর কার্যক্রম আরো বেগবান হবে ইনশাআল্লাহ। ফ্রেন্ডশিপের টিম লিডার রুম্মানুল ফেরদৌস বলেন, আমরা এই দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষার জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মান করা সহ নানামুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছি। এই চলাঞ্চলে সবুজায়নের লক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িতে ফলস বৃক্ষ রোপন করা হয়েছিল যা এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এবং সুফল ভোগীরা উপকার পাচ্ছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এর কুফল সকলকে জানাতে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক বিভিন্নভাবে আমাদের উঠান বৈঠক নিয়মিত চলে। এছাড়াও স্থানীয় যেকোনো ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য আমরা আইনি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করেছি। সেই কেন্দ্রে একজন প্রশিক্ষিত ফ্রেন্ডশিপ কমিউনিটি প্যারালিকাল নিয়োগ করা আছে। যেখানে স্থানীয় পর্যায়ের যেকোনো ধরনের বিরোধ সমাধান করা হচ্ছে। যেটা সম্ভব হয় না সেটা উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়।
স্থানীয়দের মতে, আগে গোপনে অনেক বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, অভিভাবক ও কিশোর-কিশোরীদের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে বাল্যবিবাহের ঘটনা আগের তুলনায় কমছে এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কমিউনিটি নেতৃত্ব, প্রশাসনিক সহযোগিতা, আইনের প্রয়োগ এবং কিশোরীদের ক্ষমতায়নের এই সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে কুড়িগ্রামের দুর্গম চরাঞ্চলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও টেকসই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে। এ সময় সিনিয়র রিজিওনাল ম্যানেজার মোহাম্মদ নাঈম কামরান, প্রজেক্ট ম্যানেজার আহসান হাবিব, প্রজেক্ট অফিসার ইনক্লুসিভ সিটিজেনশিপ তানভীর হোসেন আরিফ, সুপারভাইজার মেহেদী হাসান মিম সহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা তাদের সাথে থেকে চরের বিভিন্ন দিক পরিদর্শন করেন।