বাড়ির ছাদে জিনসেং চাষ করে সংসার চালান আইনুল
আবু বাককার সুজন, বিশেষ প্রতিবেদক

জিনসেং সকলের কাছে অতি পরিচিত একটি ওষুধি গাছ। এই ওষুধি গাছ জিনসেং বর্তমানে সারাবিশ্বে সর্বদা সুপার ফুড হিসেবে ব্যবহার হয়। এ কারণে দেশ-বিদেশে এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে জিনসেং এর চাহিদা পূরণ করতে এখন বাণিজ্যিকভাবে জিনসেং চাষ শুরু করেছেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মধ্য দৌলতপুর গ্রামের আইনুল ইসলাম।
স্নাতক পাস করা এই যুবক ওষুধ কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি বাড়ির ছাদে প্রাথমিকভাবে জিনসেং চাষ শুরু করেন। এতে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক সফলতা আসায় বর্তমানে তিনি দশ কাঠা জমি কন্ট্রাক্ট নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে জিনসেং চাষ শুরু করেছেন। সেই জমিতে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার জিনসং গাছ রয়েছে। জিনসেং চাষ করে যা আয় হয় তা দিয়েই চলে তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও বাবা-মা সহ ৬ সদস্যের সংসার।
আইনুল ইসলাম জানান, ২০২০ সালে করোনার সময়ে ইউটিউবে ঔষধি গাছ জিনসেং সম্পর্কে জেনেছেন। তবে চাষের জন্য জমি না থাকায় স্থির করেন বাড়ির ছাদেই চাষ শুরু করবেন। এ জন্য ছাদে বস্তার ভেতর বেলে দোআঁশ মাটি দিয়ে জিনসেং গাছের চারা রোপণ করেন। ইউটিউব থেকে শেখা চাষের পদ্ধতি অনুসরণে এক বছরের মধ্যে ভালো ফল পান তিনি। পরে সেগুলো থেকে বীজ সংগ্রহ করে ছাদের প্রায় পুরো অংশেই এবং কন্ট্রাক্ট নেওয়া জমিতে বাণিজ্যিকভাবে জিনসেং চাষ শুরু করেন।
আইনুলের স্ত্রী হাসিনা আক্তার জানান, তার স্বামী ওষুধ কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি জিনসেং চাষ করে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে জিনসেং চাষের আয় থেকে ভালোভাবেই চলছে তাঁদের সংসার।
গতকাল শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির ছাদে ও কন্ট্রাক নেওয়া জমিতে লাগানো জিনসেং গাছের পরিচর্যা করছেন আইনুল । তাকে কাজে সহযোগিতা করছেন তার সহধর্মিনী হাসিনা আক্তার। এ সময় আইনুল জানান, সারা বছরই জিনসেং সংগ্রহ করা যায়। এ জন্য একটি গাছ পরিপূর্ণ হতে এক বছরের মতো সময় লাগে। ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে নিজ এলাকায় চাকরি করেন। তাই জিনসেং চাষ ও বিক্রি করতে সুবিধা হয়। জিনসেংয়ের মূল ওঠানোর পর সেগুলো রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে বিক্রি করেন আইনুল। অনলাইন ছাড়া এলাকায়ও বিক্রি হয় এ গুঁড়া। ১০০ গ্রাম পাউডার বিক্রি করেন ১ হাজার ২০০ টাকায়। ইট, বস্তা, বাঁশ ও জৈব সার কেনার খরচ বাদে প্রতি মাসে তাঁর ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। চাকরির অর্থের সঙ্গে অতিরিক্ত এ অর্থ দিয়ে মা-বাবাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেই তাঁর সংসার চলছে বলে জানান আইনুল। তাঁর মতে, একসময়ের টানাপোড়েনের সংসারে এখন আর কোনো অভাব নেই।
অন্য কিছু বাদ দিয়ে কেন জিনসেং চাষ করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আইনুল বলেন, ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখেছেন, এই ঔষধি গাছের অনেক গুণাগুণ। এটি চাষে পরিশ্রম কম এবং বাজারে এর চাহিদা থাকায় চাষে ঝুঁকেছেন। এ ছাড়া ফাঁকা পড়ে থাকা ছাদে এটি চাষ করা সহজ। সেই সঙ্গে অল্প শ্রমে তুলনামূলক লাভজনক। এমন সব ভাবনা থেকেই তাঁর জিনসেং চাষের শুরু।
স্থানীয় কয়েকজন ওষুধ বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জিনসেং ডায়াবেটিস ও ফুসফুস রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া জিনসেং সকল বয়সী নারী-পুরুষের হরমোন শক্তি বৃদ্ধি করে, মানসিক টেনশন দূর করে, ভালো ঘুম হয়, গ্যাস্ট্রিকের প্রবলেম কমায়, হজম শক্তি বৃদ্ধি করে, অতিরিক্ত মেদ ভুড়ি কমায়, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল কমাই, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে, প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করে, স্কিনের প্রবলেম দূর করে এবং স্কিননকে ভালো রাখে। কাজেই ব্যাপক চাহিদার কারনে তারা আইনুলের কাছে থেকে জিনসেংয়ের গুড়া কিনে বাজারে বিক্রি করে থাকেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ওষধি গাছ হিসেবে জিনসেংয়ের অনেক গুণাগুণ আছে। মানুষের ব্যাপক চাহিদার কথা বিবেচনা করে আইনুল ইসলাম বাণিজ্যিকভাবে এই জিনসেং চাষের উদ্যোগ নেওয়ায় তার প্রশংসাও করেন তিনি।