নড়াইলে ৭ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ:৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন
নড়াইল প্রতিনিধি:

নড়াইল সদর উপজেলার আর.বি.এফ.এম ভবানীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুমিন হাওলাদারকে (১৩) ক্লাসরুমে আটকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলামসহ দুই সহকারী শিক্ষক নুরুজ্জামান নান্নু ও ইসরাফিল হোসেনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করা হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ্য ওই শিক্ষার্থী বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ দিকে সোমবার (২৪ আগষ্ট) দুপুর ২টার দিকে এ ঘটনায় গঠিত ৫ সদস্যের তদন্ত টীম ঘটনাস্থল ওই স্কুল এবং শিক্ষার্থীর বাড়ি পরিদর্শন করেছেন।

এর আগে গত বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে আটকে রেখে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থী ও তার স্বজনরা। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে নড়াইল জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে যশোরে সিটি স্ক্যান করানো হয়। বর্তমানে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মুমিনের বাবা মারা গেছেন এবং তার মা অন্যত্র বিয়ে করায় ছোটবেলা থেকেই সে দাদির কাছে থাকছে। ছোটবেলায় একটি দুর্ঘটনায় তার মাথায় ৩২টি সেলাই দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকেই সে শারীরিকভাবে দুর্বল বলে পরিবার জানিয়েছে।
ভুক্তভোগী মুমিন হাওলাদার অভিযোগ করে জানায়, বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে পাশের ষষ্ঠ শ্রেণির কক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে মারামারি হচ্ছিল। সে বিষয়টি দেখতে সেখানে গেলে শিক্ষকরা তাকে ধরে ক্লাসরুমে নিয়ে যান। সেখানে প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম, সহকারী শিক্ষক নুরুজ্জামান নান্নু ও ইসরাফিল হোসেন তাকে মারধর করেন। এ সময় স্যারেরা দেয়ালের সঙ্গে মাথায় আঘাত করা, চুল ধরে টানা এবং বেত দিয়ে পেটায়।
মুমিন আরো জানায়, মারধরের পর তার মাথায় তীব্র ব্যথা শুরু হয়। সে ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পরপর অচেতন হয়ে পড়ছিল এবং বমি করছিল। পরে তাকে নড়াইল জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক দ্রুত সিটি স্ক্যান করানোর জন্য যশোরে পাঠান। সিটি স্ক্যান শেষে তাকে আবার নড়াইল জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনার বিষয়ে বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গেলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি।তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত দুই সহকারী শিক্ষকরা।
সহকারী শিক্ষক নুরুজ্জামান নান্নু বলেন, সপ্তম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে মারধর করছে, এমন অভিযোগ পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে মুমিনসহ ছয়-সাতজন শিক্ষার্থীকে দেখতে পান। পরে তাদের সরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও কোনো শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। বিষয়টি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও অভিভাবকদের জানিয়ে বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা হয় বলেও তিনি জানান।
এ ব্যাপারে সহকারী শিক্ষক ইসরাফিল হোসেন মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘মুমিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেছিল। পরে তাদের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে অভিভাবকদের বিষয়টি জানানো হয়। অভিভাবকরা দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে কোনো শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়নি।’
এদিকে ঘটনার সময় মুমিনের সঙ্গে থাকা সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী দাবি করে, মারামারির পর শিক্ষকরা তাদের ক্লাসরুমে ডেকে নিয়ে সবাইকে মারধর করেন। তবে মুমিনকে তুলনামূলক কম মারা হয় বলে জানায় সে।
এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুমিন হাওলাদারকে দেখতে যান নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিংকন বিশ্বাস ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টি এম রাহসিন কবির। তারা তার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং ঘটনার বিষয়ে তার কাছ থেকে বিস্তারিত শোনেন।
এদিকে ঘটনাটি তদন্তের জন্য ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত টীমের আহবায়ক হলেন সদর উপজেলা সহকারী কমিশিনার (ভূমি) কে এইচ তাসফিকুর রহমান, ৪জন সদস্য যথাক্রমে সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আনোয়ার হোসেন, সদর উপজেলা একাডেমীক সুপার ভাইজার সজল বিশ্বাস, সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাসেল সরোয়ার ও নড়াইল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রশিদ লাবলু। এদিকে তদন্ত কমিটির সদস্যবন্দ সোমবার (২৪ আগষ্ট) দুপুরে ঘটনাস্থল আর.বি.এফ.এম ভবানীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও নির্যাতিত শিশুটির বাড়ি পরিদর্শন করেছেন।
তদন্ত কমিটির আহবায়ক সদর উপজেলা সহকারী কমিশিনার (ভূমি) কে এইচ তাসফিকুর রহমান বলেন, তদন্ত কমিটির সদস্যদের নিয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল ও ওই শিক্ষার্থীর বাড়ি পরিদর্শন করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।