দেড় দশকের বিদ্যুৎ উন্নয়ন, তবু কেন অন্ধকার

বিশেষ প্রতিনিধি

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াট। ফলে কাগজে-কলমে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট বেশি।

কিন্তু বাস্তবে সব কেন্দ্র থেকে একসঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানি সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ, কয়লা ও তেল সরবরাহের ঘাটতি, অর্থসংকটসহ নানা কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে অথবা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে। ফলে স্থাপিত সক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭০টির বেশি কেন্দ্র কোনো না কোনো সময় পুরোপুরি বন্ধ অথবা কম সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে গিয়ে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সংকট তৈরি হয়েছে গ্যাস সরবরাহে। দেশের বেশ কয়েকটি বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ এর চেয়ে কয়েক শ মিলিয়ন ঘনফুট কম থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। গত কয়েক বছরে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ বেড়েছে।

একই সময়ে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় এই নির্ভরতার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও জ্বালানি সরবরাহ বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পায়রা ও রামপালের মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে বিপুল পরিমাণ কয়লা প্রয়োজন। বকেয়া বিল পরিশোধে সমস্যা তৈরি হলে কয়লা আমদানি ও সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হয়। এতে উৎপাদন কমে যায়।

বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের বিপুল পরিমাণ বকেয়া রয়েছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হলে জ্বালানি সংগ্রহ করে আরও কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। কোনো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রাখার বিপরীতে নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থাকে ক্যাপাসিটি চার্জ বলা হয়।

বিদ্যুৎ খাতের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এর প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে কেন্দ্র স্থাপনের সক্ষমতার জন্য অর্থ পরিশোধের ফলে রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এসব চুক্তি করা হয়েছিল।

২০০৯ সালের পর দেশে বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত মোকাবিলায় কুইক রেন্টাল ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন সরকারের লক্ষ্য ছিল স্বল্প সময়ে উৎপাদন বাড়িয়ে বিদ্যুতের ঘাটতি কমানো।

এ জন্য বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়। এর আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে প্রচলিত কিছু প্রক্রিয়া শিথিল করা হয়েছিল। পরে এই ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুক্তিতে বিশেষ ব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ফলে বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে রাষ্ট্রের ব্যয় বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতের এই কাঠামো তৈরির সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন সচিব আবুল কালাম আজাদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা নসরুল হামিদও দীর্ঘ সময় এ খাতের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সমালোচকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের নীতির ধারাবাহিকতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালনব্যবস্থা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি হয়নি।

তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত ভিত্তি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার, স্বজনদের ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়া এবং সম্পদ অর্জনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্প এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে মিটার স্থাপন, গ্রাহকসেবা প্রযুক্তি, নেটওয়ার্ক ও নিরাপত্তা অবকাঠামোসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও বলা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চুক্তি, মালিকানা কাঠামো, সরকারি অনুমোদন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন।

নসরুল হামিদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা এবং অর্থ পাচারের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে তাঁদের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে বিদেশে কোনো সম্পদ থাকা মানেই তা অবৈধভাবে অর্জিত বা পাচারের অর্থে কেনা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের নথি, অর্থের উৎস এবং বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক সচিব ও পরে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করা আহমদ কায়কাউসের সময়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

সমালোচকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় বর্তমান সংকটের ভিত্তি আগেই তৈরি হয়েছে।

বর্তমান লোডশেডিংকে শুধু বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যাবে। একইভাবে অতীত সরকারের সব সিদ্ধান্তকেও বর্তমান সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে—গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা ও জ্বালানি তেল আমদানির সমস্যা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত সিদ্ধান্ত।

তবে গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, সেই সক্ষমতার বড় অংশ এখন কেন কাজে লাগানো যাচ্ছে না—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়; ভবিষ্যতের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানির বহুমুখীকরণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন, চুক্তিতে স্বচ্ছতা এবং প্রকল্প ব্যয়ের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও যদি জ্বালানি না থাকে, কেন্দ্র চালু রাখা না যায় কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকে, তাহলে কাগজে থাকা হাজার হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা সাধারণ মানুষের ঘরে আলো জ্বালাতে পারবে না।

বর্তমান লোডশেডিং তাই শুধু সাময়িক বিদ্যুৎ ঘাটতির ঘটনা নয়; এটি গত দেড় দশকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, বিনিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

আরো দেখুনঃ