এক বিদ্যালয়ে দুই সাইনবোর্ড, একই জমি তিন বিদ্যালয়ের নামে দান

জাবেদ হোসাইন মামুন, সোনাগাজী (ফেনী) প্রতিনিধি।।

59
সোনাগাজীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে। একই জমি দুইটি সরকারি প্রাথমিক ও একটি নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামে দান করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে জয়নাল আবেদীন নামে এক ব্যক্তি।
এমনটাই অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী। তবে দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয় তার নিজ নামে ও নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি তার স্ত্রীর নামে নামকরণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলো হচ্ছে জয়নাল আবেদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাংলা বাজার জয়নাল আবেদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হাসিনা আবেদীন নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়।
জয়নাল আবেদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন থাকলেও বাংলা বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। জমি দাতা জয়নাল আবদিন সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের চরলামছি গ্রামের নূর আহম্মদের ছেলে।
তিনি ঢাকায় গণপূর্ত বিভাগের একজন অফিস সহকারি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। একসময়ের দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও চাকুরীতে থাকাকালীণ সময়ে কাডি কাডি টাকার মালিক হন তিনি। বর্তমানে ঢাকা শহরে তার ৬টি বিলাস বহুল বাড়ি ও অভিজাত একাধিক মার্কেটে ১১টি দোকানের মালিক তিনি। এক শ্রেনির দুষ্টু চক্রের সহযেগিতায় জয়নাল আবেদীন প্রতারণায় গড়ে উঠা বিদ্যালয় গুলোর মধ্যে জয়নাল আবেদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি ও ভবন আছে।
কিন্তু নেই কোন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। আবার একই জমিতে গড়ে তোলা হাসিনা আবেদীন নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়।বাংলা বাজার জয়নাল আবদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আছে। কাগজেকলমে জমি থাকলেও বহ্যিকভাবে কোন ঘর, ভবন বা জমি নেই। তবে দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে একটির শ্রেনি কার্যক্রম চললেও অন্যটির নেই কোন শ্রেনি বা পাঠদান কার্যক্রম। দীর্ঘ ৬-৭ বছর যাবৎ এমনিভাবে চলছে সরকারি দুইটি বিদ্যালয়ের হালচাল।
সাম্প্রতিক সময়ে এক বিদ্যালয়ে ভিন্ন নামে দুই সাইনবোর্ড ও জমি দান নিয়ে গোপন রহস্য বেরিয়ে আসলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের চাপে বাংলা বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে নতুন করে জমি কেনার তোড়জোড় শুরু করেন জয়নাল আবেদীন। এ নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
এসব বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি জয়নাল আবেদীন ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। এলাকাবাসী ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জয়নাল আবেদীন ২০০৪ সালে বাংলা বাজার জয়নাল আবেদীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে ৩০শতক জমি দান করে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই নামেই চলেছিল বিদ্যালয়টির পাঠদান কার্যক্রম।
এদিকে সরকার ২০১৩ সালে সারা দেশব্যাপী বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে সরকারিভাবে ১৫০০প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী সোনাগাজী উপজেলায় ৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের অনুমোদন পায়। কিন্তু রাতারাতি অর্থাৎ ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা দেখিয়ে জয়নাল আবেদীন প্রাথমিক বিদ্যালয় নাম দিয়ে প্রস্তাব প্রদান করা হয়। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়বিহীন গ্রামের আওতায় ওই জমির নাম পরিবর্তন করে জয়নাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে প্রায় ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়।
নির্মাণ কাজ শেষে সোনাগাজী উপজেলার ৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়ের মধ্যে ৫টিতে শিক্ষক পদায়ন করা হলেও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে তৎকালীণ শিক্ষা কর্মকর্তা ওই প্রাথমিক বিদ্যলয়ে কোন শিক্ষক পদায়ন করেননি। কিন্তু কাগজে কলমে থাকা বাংলা বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কে ওই ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর মৌখিকভাবে অনুমতি দেন। সে অনুযায়ী তারা ওই বিদ্যালয়ে শ্রেনি কার্যক্রম চালাতে থাকেন।
এদিকে বাংলা বাজার জয়নাল আবদিন প্রাথমিক বিদ্যলয়টির নামে অন্য কোন জমি চিহ্নিত না থাকলেও ওই নামে ফাইল প্রস্তুত করে সরকারি করণের আবেদন করে তদ্বীর করে ২০১৪ সালে ওই বিদ্যালয়টিও সরকারি করণ করা হয়। বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে সরকারিভাবে নির্মিত জয়নাল আবদিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দীর্ঘ ৭ বছর অতিবাহিত হলেও ওই বিদ্যালয়ে কোন শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি।
অন্যদিকে বাংলা বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির শিক্ষক, শিক্ষার্থী থাকলেও বিদ্যালয়টির দীর্ঘ ৬ বছরেও চিহ্নিত জমি, ঘর বা ভবন নির্মাণ করা হয়নি। অনিয়মতান্ত্রিক ভাবেই চলে গেছে ৬-৭ বছর। ২০১৩ সালে জয়নাল আবেদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বিদ্যালয়বিহীন গ্রামের আওতায় সরকারি করণ করা হয় এবং বাংলা বাজার জয়নাল আবেদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সরকারি করণ করা হয় ২০১৪ সালে। আর হাসিনা আবেদীন নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেনি কার্যক্রম চলছে জয়নাল আবেদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কম্পাউন্ডে একটি টিন শেড ঘরে। সেটিও ১৬১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নূরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানাজানির পর জেলা সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহ আলম ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওয়াহিদুজ্জামানকে সদস্য করে দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আমার হাতে এসে পৌঁছায়নি। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে একটি বিদ্যালয় রাখার ব্যাপারে সুপারিশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে প্রেরণ করা হবে। তবে যে বা যারা অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে তারা ঠিক করেনি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, তৎকালীণ শিক্ষা কর্মকর্তাদের দায়ীত্বে অবহেলার কারণে এমনটা ঘটেছে। যে বিদ্যলয়ের নামে কোন জমি নেই, সে বিদ্যালয়টি কিভাবে সরকারি করণ করা হলো? এসব প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠাতা ও জমি দাতা জয়নাল আবেদীন অভিযোগ অস্বীকার না করে জানান, আমি প্রয়োজনে অন্যত্র জমি ক্রয় করে দিব। দীর্ঘ ৬-৭বছর পর্যন্ত অনিয়মের ব্যাপারে তিনি মুখ খুলতে রাজি হননি।
আমিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম জহির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, জমি দাতা, তৎকালীণ প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও বাংলা বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পরস্পর যোগসাজসে বছরের পর বছর এই অনিয়ম করে চলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চরলামছি গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধা জানান, একসময় অভাবের তাড়নায় নূন আনতে পান্তা পুরাতো জয়নাল আবেদীন ও তার পরিবারের সদস্যদের।
গ্রামের বাড়িতে তার পিতার মালিকীয় মাত্র ৪০ শতক জমির মালিক থাকলেও জয়নাল আবেদীন গ্রামের চরলামছি ডুব্বা মৌজায় বর্তমানে প্রায় ৬০০শতক জমির মালিক রয়েছেন। গণপূর্ত বিভাগের অফিস সহকারি হিসেবে কর্মরত থেকে নামে বেনামে ঢাকা শহরে ৬টি বিলাস বহুল বাড়ি ও অভিজাত একাধিক মার্কেটে ১১টি দোকানের মালিক বনে গেছেন তিনি। কালো টাকা সাদা করতে সম্ভাবত সে দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে।
সে একই জমি তিনটি বিদ্যলয়ের নামে দান করেছেন। দুইটি তার নামে সরকারি করণ করা হয়েছে অপরটি তার স্ত্রীর নামে হাসিনা আবেদীন নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় নামে নামকরণ করা হয়েছে।
আরো পড়ুনঃ