আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশ অমান্য করে প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দখলচেষ্টার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার :

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের চৌদার মৌজার একটি রেকর্ডীয় জমিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিচারাধীন মামলায় আদালতের জারি করা স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) আদেশ অমান্য করে বিতর্কিত জমিতে স্থাপনা নির্মাণ ও দখল বজায় রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দা হারুন অর রশীদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, তিনি একজন আইনজীবীর বাবা হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র থেকে জানা যায়, চৌদার মৌজার সাবেক ১৪০৪, হাল ৩০৪৫ নম্বর দাগের জমি সিএস ১৬, এসএ ২২ এবং বিআরএস ২৮ নম্বর খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। সিএস ও এসএ রেকর্ডে অনাথ দাস, পিতা কাশী দাস-এর নামে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯৬ সালের ৩ অক্টোবর ওই খতিয়ান থেকে ২.৪০ শতাংশ জমি অনাথ চন্দ্র রায় তার পুত্রবধু শ্রীমতি মিনতি রানী দাস্যাকে দানপত্র মূলে দলিল করে দেন।

অন্যদিকে বিবাদীপক্ষের সিএস খতিয়ান-৬৩, এস এ -১৭০ খতিয়ানে সাবেক ১৪০৪, হাল ৩০৪৫ নম্বর দাগের
ওই একই ১৩ শতাংশ জমি ১৯৮৫ সালের বিআরএস রেকর্ডে সাছুনী দাসের ওয়ারিশ যতীন্দ্র চন্দ্র দাস-এর নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে যতীন্দ্র চন্দ্র দাস এবং তার উত্তরাধিকারী সুনীল চন্দ্র দাস, নিখিল চন্দ্র দাস, অজিত চন্দ্র দাস ও সুজিত চন্দ্র দাস জমিটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছিলেন।

পরবর্তীতে মৃত অনিল চন্দ্র দাসের একমাত্র ছেলে অপূর্ব চন্দ্র দাস তার পৈতৃক অংশ নিজ নামে নামজারি সম্পন্ন করে স্থানীয় শহিদুল হকসহ চারজনের কাছে নিবন্ধিত সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করেন। ক্রেতাদের নামেও যথাযথভাবে জমা-খারিজ সম্পন্ন হয়েছে ইতিমধ্যে। কষ্টার্জিত টাকায় জমি কিনে মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় বিপাকে পড়েছেন তারাও।

শহীদুল হক আকন্দ বলেন, চৌদার মৌজায় দলিলমূলে ক্রয় করা সোয়া ২ শতাংশ জমিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঘর নির্মাণ করে ভোগদখলে আছেন। কিন্তু প্রতিবেশী হারুন অর রশিদ বাচ্চু, তার ছেলে বিপ্লব মিয়া ও তাদের সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করে আসছেন।

তিনি জানান, গত ২৬ মে ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যায় অভিযুক্তরা দা, লাঠিসোঁটা নিয়ে তার নির্মিত ঘরে জোরপূর্বক শাটার লাগানোর চেষ্টা করেন। তিনি বাধা দিতে গেলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে তিনি প্রাণভয়ে সেখান থেকে সরে যান। এ সময় স্থানীয় লোকজন ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন।

শহীদুল হক আকন্দ আরও বলেন, অভিযুক্তরা তাকে ও তার পরিবারের সদস্যরা জমিতে গেলে হত্যা ও গুরুতর ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছেন। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেও সমাধান না হওয়ায় তিনি ফুলবাড়ীয়া থানায় অভিযোগ দিয়েছেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত প্রতিকার কামনা করেছেন।

এদিকে হারুন অর রশীদ বাচ্চু দাবি করেন, ১৯৯৬ সালের ৮৩৫৪ নম্বর দলিলের মাধ্যমে অনাথ চন্দ্র দাসের পুত্রবধূ মিনতি রানী দাস্যা ২০ শতাংশ জমির মালিক হন এবং পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ৪৪৮ নম্বর নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তিনি ওই জমি হারুন অর রশীদের কাছে হস্তান্তর করেন। সেই সূত্র ধরে তিনি জমির মালিকানা দাবি করে ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়ীয়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে (মোকদ্দমা নং-৯/২০২২) চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা দায়ের করেন।

তবে বিবাদীপক্ষের অভিযোগ, হারুন অর রশীদের দলিলে জমির পরিমাণ নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। তাদের দাবি, মিনতি রানী দাস্যার কাছ থেকে তিনি যে পরিমাণ জমি পেয়েছেন বলে দাবি করছেন, তা মূল মালিকানার তুলনায় প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি। ওই অতিরিক্ত জমির হিসাব মিলাতেই তিনি অন্যের বিআরএস রেকর্ডীয় জমির ওপর দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।

মামলাটি বিচারাধীন থাকাবস্থায় আদালত নালিশী জমির ওপর উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ দেন। ওই নিষেধাজ্ঞার আদেশে বলা হয়েছিল, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মাটি ভরাট কিংবা কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।

কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, সেই আদেশ উপেক্ষা করে হারুন অর রশীদ বাচ্চু বিতর্কিত জমিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণ, পাকা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দখল বজায় রেখেছেন।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ রেকর্ডীয় মালিকদের উত্তরাধিকারীরা আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন, অবৈধ নির্মাণ বন্ধ এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা কার্যকর না হলে বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে এবং ভবিষ্যতে আদালতের আদেশ অমান্যের প্রবণতা আরও বাড়বে।

ভুক্তভোগী অপূর্ব দাসের বক্তব্য অপূর্ব দাস বলেন, “আমার দাদা যতীন্দ্র চন্দ্র দাসের নামে এই জমির বিআরএস রেকর্ড রয়েছে। এখানে আমাদের ১৩ শতাংশ জমি আছে এবং এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ থাকা সত্ত্বেও হারুন অর রশীদ বাচ্চু অবৈধভাবে জোরপূর্বক জমি দখল করছেন। আমি যে ঘর নির্মাণ করেছিলাম, সেখানে তিনি শাটার লাগিয়ে জোর করে দখল নিয়েছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছি। আমি চাকরির কারণে ঢাকায় থাকি এবং নিয়মিত এলাকায় থাকতে পারি না। সেই সুযোগে তিনি আমাদের সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছেন। এক সময় আমাদের অনেক হিন্দু শরিক ছিল। তাদের অধিকাংশই ভারতে চলে গেছেন। অল্প কিছু টাকা দিয়ে তাদের সম্পত্তিও বেদখল করা হয়েছে। এখন শুধু আমরাই এখানে আছি এবং প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছি।”

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, “গত তিন-চার মাস আমি গ্রামেই আসিনি। এলাকার মানুষও বলতে পারবে, এই সময়ের মধ্যে আমি এলাকায় ছিলাম না। অথচ আমাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে ৭ ধারায় একটি মামলা করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে আমি নাকি এলাকায় হাঙ্গামা করেছি।”

ঘটনাস্থলের দক্ষিণ পাশের আরেকটি জমি দেখিয়ে অপূর্ব দাস বলেন, “এই জমিটিও আমাদের। এটিও হারুন অর রশীদ বাচ্চু দখল করে রেখেছেন। তিনি আমাকে এই জমিতে প্রবেশ করতে দেন না। ফলে আমরা সেখানে চাষাবাদও করতে পারছি না। এছাড়া হারুন অর রশীদ বাচ্চু ও তাঁর ছেলে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমাদের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন।” এমনকি ফোনে আমাকে হুমকিও দিয়েছেন প্রতিপক্ষ।

হারুন অর রশীদ বাচ্চুর বক্তব্য অভিযোগ অস্বীকার করে হারুন অর রশীদ বাচ্চু বলেন, ১৯৯৭ সালে আমি অনাথ বন্ধু দাসের কাছ থেকে এই পুকুরসহ ২ একর ৭৮ শতাংশ জমি ক্রয় করেছি। তখন পুকুরের ভোগ-বণ্টন বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ছিল। তারা ১২ বা ১৩ শতাংশ জমির দাবি করছে। কিন্তু ২০০০ সালের মাঠ পর্চায় আমার নামে ১৪ শতাংশ রেকর্ড হয়েছে।

অপূর্ব দাস কীভাবে খারিজ করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই জমির খারিজ অপূর্ব করতে পারে না। কারণ আমি অনাথ বন্ধু দাসের কাছ থেকে বৈধভাবে জমিটি কিনেছি। এখন তারা দাবি করছে, অনাথ বন্ধু দাসের আলাদা খতিয়ান ছিল।

অপূর্বর দাবি, তিনি ঘর নির্মাণ করেছিলেন, পরে বাচ্চু দখল করেছেন এ বিষয়ে তিনি বলেন, এটি সঠিক নয়। ঘরটি আমিই নির্মাণ করেছি। পুরো গ্রামের মানুষ বিষয়টি জানে। অপূর্ব আগেও মামলা করেছিল, সেই মামলা শেষ হয়েছে।

মামলার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, সুনীল চন্দ্র গংদের সঙ্গে মামলা চলমান। অপূর্ব দাবি করছে, জমিটি তার। কিন্তু জমিটি আমার ভোগদখলে রয়েছে। আমি আদালত থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এনেছি। আমার কাছে জমির সব কাগজপত্র রয়েছে। আগে একবার মামলা হয়েছে এবং তারা ডিক্রি পেয়েছে। যদি প্রমাণ হয় যে পুকুরটি তাদের দাদার নামে সাব-কবলা রয়েছে, তাহলে আমি জমি ছেড়ে দেব। এটি সম্পূর্ণ অনাথ বন্ধু দাসের খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি। তবে পুকুরের ওপারের কিছু জমি হয়তো তাদের থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, মামলার রায় আদালত দেবেন। আদালত যদি তাদের পক্ষে রায় দেন, তাহলে আমি জমি বুঝিয়ে দেব।

হারুন অর রশীদের ছেলে অ্যাডভোকেট বিপ্লব বলেন, ওই মামলায় আমার পক্ষেই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ২০২২ সালে মামলা করেছি। এরপর ২০২৩ সালেও বিভিন্ন আদেশ আমার পক্ষেই ছিল। পরে বিষয়টি সিভিল কোর্টে গেলে আমি জমির ওপর স্থিতাবস্থার আদেশ (Status Quo) চেয়েছি। যদি আমি আদালতের সেই আদেশ লঙ্ঘন করে থাকি, তাহলে প্রতিপক্ষ সিভিল কোর্টে আমার বিরুদ্ধে আদেশ লঙ্ঘনের আবেদন করতে পারেন।

মামলা চলাকালে কোনো পক্ষেরই কাজ করার সুযোগ না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটি আদালতের বিষয়। আপনি আপনার সংবাদ প্রকাশ করুন।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মমরুজুল হাসান জুয়েল জানান, আদালত (Status Quo) বা স্থিতাবস্থার আদেশ জারি করলে কোন পক্ষই সেখানে কোন প্রকার স্থাপনা নির্মাণের কাজ করতে পারবে না। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অবস্থানেরও পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না। কেউ তা করলে আদালত অবমাননার সামিল হবে। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ করলে পুলিশও আপনাকে সহযোগিতা করবে

আরো দেখুনঃ