কুড়িগ্রামে মাদরাসার কাঁঠাল গাছ কাটার অভিযোগে, ১২ দপ্তরে লিখিত অভিযোগ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

কুড়িগ্রামে বসুনিয়ারহাট আহম্মদিয়া দাখিল মাদরাসার একটি বড় কাঁঠাল গাছ কর্তনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির সুপারিনটেনডেন্টের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ ১২টি সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদরাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির কোনো সিদ্ধান্ত বা রেজুলেশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই গত ২৫ সেপ্টেম্বর মাদরাসা বন্ধের দিনে একটি বড় কাঁঠাল গাছ কেটে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় লোকজন গাছটি নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দিলে তা মাদরাসা প্রাঙ্গণেই রেখে দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মাদরাসা সুপার জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের সভাপতির অনুমতি নিয়েই গাছটি কাটা হয়েছিল এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা তাঁর ভুল হয়েছে।

লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের বসুনিয়ারহাট আহম্মদিয়া দাখিল মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট শাহ মো. নূরে আলম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গাছ কাটার অভিযোগে স্থানীয় ৫০ জন ব্যক্তি গণস্বাক্ষর করেছেন। অভিযোগটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা বন বিভাগ, দুদক, জেলা শিক্ষা অফিস, সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, সদর উপজেলা ভূমি অফিস, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়, জাতীয় মানবাধিকার ইউনিট এবং মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গত ২৫ সেপ্টেম্বর মাদরাসা বন্ধ থাকার সুযোগে একটি বড় কাঁঠাল গাছ কেটে তা বিক্রির চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পেরে গাছটি মাদরাসা মাঠে আটকে রাখেন। পরে গাছটি আর সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে কর্তন করা গাছটি মাদরাসা প্রাঙ্গণেই পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কর্তন করা কাঁঠাল গাছটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ হাজার টাকা। তবে কাঠ ব্যবসায়ী রিপন মিয়া দাবি করেছেন, মাদরাসা সুপার তাঁর কাছে গাছটি ১৩ হাজার টাকায় বিক্রির বন্দোবস্ত করেছিলেন।

রিপন মিয়া বলেন, মাদরাসা সুপার আমার কাছে ১৩ হাজার টাকায় কাঁঠাল গাছটি বিক্রির বন্দোবস্ত করেছিলেন। ওই দামে গাছটি নিয়ে ইউক্যালিপটাস কাঠ সংগ্রহ করার কথা ছিল।

গণস্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এর আগে মাদরাসা প্রাঙ্গণের আনুমানিক চারটি ইউক্যালিপটাস গাছও কেটে বিক্রি করা হয়েছে। এসব গাছ কাটার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

স্থানীয় রমজান আলী, নুর ইসলাম, আনিছুর, রাজু আহমেদ, আশরাফুল আলম, রুহুল আমিন, মহুবর রহমান, বাবু বসুনিয়া ও মোখলেছ বসুনিয়াসহ কয়েকজন বলেন, মাদরাসা বন্ধের দিনে একটি বড় জীবন্ত কাঁঠাল গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে আমরা সেখানে গিয়ে গাছটি আটকাই। এর আগেও মাদরাসার কয়েকটি বড় ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছি।

তবে অভিযোগের বিষয়ে মাদরাসা সুপার শাহ মো. নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, মাদরাসার সভাপতি মাহাবুর রহমানের অনুমতি নিয়েই গাছটি কর্তন করা হয়েছে। তবে নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা আমার ভুল হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের এডহক কমিটির সভাপতি ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহাবুর রহমান বলেন, মাদরাসার ফার্নিচার তৈরির জন্য স্থানীয়দের পরামর্শে গাছটি কর্তন করা হয়েছে। এছাড়া মাদরাসায় নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। গাছটি থাকলে ভবন নির্মাণে অসুবিধা হতো।

এদিকে গাছ কাটার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন কুড়িগ্রাম বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাদিকুর রহমান। তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর মাদরাসা সুপারকে গাছ কাটার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে তো সব তথ্য থাকে না। এডিসি (শিক্ষা)-এর সঙ্গে কথা বলেন। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আসাদুজ্জামানের সরকারি মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে গাছটি কর্তনের ক্ষেত্রে কোনো অনুমোদন বা বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, আগের গাছ কাটার অভিযোগের সত্যতা এবং গাছ বিক্রির অর্থের হিসাব—এসব বিষয় স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এলাকাবাসীর দাবি, মাদরাসার সম্পদ রক্ষায় গাছ কর্তনের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গাছ কর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধি ও অনুমোদন যথাযথভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরো দেখুনঃ