প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে নিজের শিশুকন্যাকে হত্যা, ১২ বছর পর বাবার মৃত্যুদণ্ড
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রতিবেশীকে মিথ্যা হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জমি বিরোধের প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের সাড়ে তিন বছরের কন্যাশিশুকে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শরীফ আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মো. আনোয়ারুল হক চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে চলা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে শরীফ আলীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ৩টার দিকে কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভানুবিল গ্রামে নিজ বসতঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় সাড়ে তিন বছর বয়সী শিশু রুনা বেগমকে ধারালো দা দিয়ে গলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, নিহত রুনার জন্মদাতা বাবা শরীফ আলীই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
পুলিশি তদন্তে জানা যায়, শরীফ আলীর সঙ্গে তাঁর চাচাতো ভাই ও প্রতিবেশীদের জমিজমা নিয়ে বিরোধ ছিল। পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিবেশী সালেক মিয়াকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি নিজের শিশুকন্যাকে হত্যা করে হত্যাকাণ্ডের দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপানোর পরিকল্পনা করেন।
তবে তদন্তের একপর্যায়ে ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসে। পরে শরীফ আলীর স্ত্রী ও নিহত শিশুর মা নেকজান বিবি বিষয়টি জানতে পেরে স্বামীর বিরুদ্ধে কমলগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার বাদী নেকজান বিবি জানান, তার মেয়ে ঘুমিয়েছিল। ঘুমের মধ্যেই তার স্বামী তার মেয়েকে দা দিয়ে কুপিয়ে হ্ত্যা করেন। হত্যার পর তার স্বামী তাকে চুপ থাকতে বলেন এবং পুলিশ ও লোকজনকে তার প্রতিবেশী সালেক মিয়ার নাম বলতে বলেন। কিন্তু তিনি তা না বলে প্রকৃত ঘটনাই পুলিশকে বলেন। একই সাথে তিনি নিজেই বাদী হয়ে তার স্বামীকে একমাত্র আসামী করে কমলগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন।
কমলগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়, মামলার তদন্তে হত্যাকাণ্ডে শরীফ আলীর সম্পৃক্ততার তথ্য বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে শরীফ আলী আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে নিজের কন্যাকে হত্যার দায় স্বীকার করে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত শরীফ আলী কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভানুবিল গ্রামের আরিফ মিয়ার ছেলে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপনের পর আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেন। ঘটনার প্রায় ১২ বছর পর নিজের সন্তান হত্যার দায়ে বাবার মৃত্যুদণ্ডের এ রায় ঘোষণা করা হলো।
নিজের স্বার্থে এবং প্রতিবেশীকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এক বাবার হাতে ঘুমন্ত শিশুকন্যা হত্যার এ ঘটনা সে সময় কমলগঞ্জজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আদালতের রায়ে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের অবসান হলো।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তোফায়েল আহমেদ জানান, ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কমলগঞ্জ উপজেলার পূর্ব ভানুবিল গ্রামের শরীফ আলী তাঁর প্রতিবেশী সালেক মিয়ার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধে জড়ান। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তিনি নিজের সাড়ে তিন বছরের শিশুকন্যা রুনা বেগমকে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় গলা কেটে হত্যা করে এর দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপান।
কিন্তু শরীফ আলীর স্ত্রী নেকজান বিবি ঘটনার আসল কারণ জানতে পেরে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলার রায়ে সোমবার দুপুরে আদালত শরীফ আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায় শোনানোর সময় শরীফ আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় শেষে তাকে কারাগরে প্রেরণ করা হয়।