বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে কক্সবাজার, কুমিল্লায় ফিরেই প্রাণ গেল তাজমিনের!
কুমিল্লা প্রতিনিধি

কক্সবাজারে যাওয়ার আগে মাকে জানিয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে। কিন্তু সেই যাত্রাই যে তার জীবনের শেষ যাত্রা হবে, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন। চার দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। পুলিশ বলছে, কক্সবাজার থেকে ফিরে বাড়ি যাওয়ার পথে সিএনজি অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় সে। গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও হত্যার কথা স্বীকার করেছে সুমন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তাজমিনের নিখোঁজ হওয়া, কক্সবাজার যাত্রা, বাড়ি ফেরার পথ এবং শেষ মুহূর্তের নানা তথ্য। তবে সে ঠিক কবে কক্সবাজার পৌঁছেছিল, নিখোঁজ থাকার পুরো সময়ে কোথায় ছিল এবং কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল—এসব বিষয়ে এখনো কিছু প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঘুরে কক্সবাজার
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথমে পাশের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায় তাজমিন। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে পরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয় বলে জানা গেছে। তবে তার যাত্রাপথের প্রতিটি ধাপ ও সময় সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির আবদুল্লাহ শনিবার রাতে জানান, ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত ৮টার পর তাজমিন এক তরুণকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের কাউন্টারে বাসের টিকিট কাটতে আসে। তখন তাঁদের দুজনকে সাধারণ যাত্রী হিসেবেই মনে হয়েছিল। পরদিন বুধবারের জন্য ছেলেটি একটি টিকিট কাটে।
আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বাসটি ঢাকা পর্যন্ত চলাচল করে।
এদিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের সিসিটিভি ফুটেজে বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ওই বাস থেকে তাজমিনকে নামতে দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে বাস কাউন্টার থেকে পাওয়া তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজের সময়ের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে যাত্রার সুনির্দিষ্ট সময়রেখা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মাকে বলেছিল বান্ধবীর বাসায় আছে
ঘটনার পর তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসার জন্য তার বান্ধবীর বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন মা।
কিন্তু বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলে তাজমিন কিছু জানায়নি। এতে মেয়েকে নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় পরিবারের।
তাজমিনের বন্ধু-বান্ধব ও চলাফেরা নিয়ে আগে থেকেই চিন্তিত ছিলেন তার মা। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি বলে জানান তিনি। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন এবং তার চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু এত সতর্কতার পরও মেয়েকে আর বাঁচাতে পারেননি তিনি।
বাড়ি ফেরার পথেই ভয়াবহ পরিণতি
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লায় ফিরে পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানে নামে তাজমিন। সেখান থেকে নগরীর রেইসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে সে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অটোরিকশার চালক সুমন মিয়া তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে একজনই জড়িত এবং সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
কেমন ছিল তাজমিন?
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি খুব চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ থাকলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত সে।
তাজমিনের বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। চাকরির কারণে সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে মেয়েকে তিনি খুব আদর করতেন বলে জানান ওই শিক্ষক।
সাদ বিন এরশাদের ভাষ্য, বাসায় রাগ হলে তাজমিন কখনো কখনো হুটহাট করে বাইরে চলে যেত।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাজমিনের সঙ্গে যেসব বন্ধু-বান্ধবের যোগাযোগ ছিল, তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তার মায়ের সন্দেহের তালিকায় থাকা এক বান্ধবী বয়সে তাজমিনের চেয়ে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবী বা অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তাজমিনের মোবাইল গেমে আসক্তি ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিষয়কে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তদন্তে প্রমাণ প্রয়োজন।
সম্পর্ক ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান মনে করেন, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের সম্পর্ক না থাকলে হয়তো তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না এবং সে এমন বিপদের মুখে পড়ত না।
তবে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে একটি কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার দায় তার ওপর বর্তায় না। অপরাধের দায় অপরাধীরই। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তা, পরিবারে যোগাযোগের পরিবেশ, নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও নতুন করে সামনে এসেছে।
তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ঘটনার প্রতিটি ধাপ নির্ভুলভাবে যাচাই করা, অপরাধের সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা এবং দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।