হাজার হাজার গ্রাহকের টাকা আত্মসাতঃ কুমিল্লায় আইসিএল শফিক ডিবির হাতে গ্রেপ্তার
কুমিল্লা প্রতিনিধি

হাজার হাজার গ্রাহকের আমানত আত্মসাতের অভিযোগে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা আইডিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড (আইসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমান ওরফে আইসিএল শফিককে গ্রেপ্তার করেছে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) দুপুরে কুমিল্লা নগরীর একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সন্ধ্যায় একাধিক মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কাগজপত্র উপস্থাপন শেষে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়।
ডিবি পুলিশ জানায়, চৌদ্দগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের করা একাধিক মামলায় শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও সাজাপ্রাপ্তির আদেশ ছিল। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইসিএল-এর মাধ্যমে আমানত রাখা বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের জমাকৃত অর্থ ফেরত না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময় পার হলেও আমানত ও মুনাফা ফেরত না দেওয়ায় গ্রাহকরা বিভিন্ন থানায় মামলা দায়ের করতে শুরু করেন।
গ্রাহকদের অভিযোগ, টাকা ফেরত চাওয়ায় অনেককে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়। কেউ কেউ হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। শফিকুর রহমানের গ্রেপ্তারের খবরে ভুক্তভোগীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
আইনগত নথি অনুযায়ী, গ্রাহকদের দায়ের করা বহু মামলায় আদালত শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। কয়েকটি মামলায় তার ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের রায়ও রয়েছে বলে জানা গেছে। দেশজুড়ে তার বিরুদ্ধে গ্রাহকদের করা মামলার সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
শফিকুর রহমান কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের ধনিজকরা এলাকার বাসিন্দা। তিনি জামায়াত থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর যোগ দেন জাতীয় পাটিতে, সে দলে তিনি কেন্দ্রিয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সর্বশেষ কেন্দ্রিয় সহ-সভাপতি হন। পরে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের সাবেক রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হকের ছত্রছায়ায় ছিলেন।
আওয়ামীলীগের ১৭ বছর সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আর্তসাৎ করার কারনে তাকে পুলিশ,ডিবি, র্যাব, সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থা আটক করলেও কেউ তাকে রাখতে পারেনি। ফ্যাসিষ্ট সরকারের এমপি মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পার পেয়ে যান।
গ্রাহকদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও সমবায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সময় সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম। সমবায় অধিদপ্তরের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে আইডিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে বড় অঙ্কের অর্থ তছরুপ ও আত্মসাতের তথ্য উঠে আসে। ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কমিটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাধ্যমে প্রায় ১৮০ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে শফিকুর রহমানকে অর্থ আত্মসাতের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তের পর গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ ও দায়-দেনা সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ও দেনার একটি তালিকা সমবায় অধিদপ্তরে দাখিল করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, তালিকাভুক্ত বহু সম্পত্তি পরবর্তীতে গোপনে বিক্রি করে ফেলা হয় এবং সেই অর্থ গ্রাহকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়নি। ভূমি অফিসের নথি যাচাই করে এসব সম্পত্তি হস্তান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, আমানত পরিশোধ দেখানোর জন্য ভুয়া রশিদ ও সমন্বয় কাগজপত্র তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বাস্তবে অধিকাংশ গ্রাহকই কোনো অর্থ ফেরত পাননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে চৌদ্দগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। কেউ কেউ অর্থ ফেরতের দাবিতে নতুন করে মামলা ও উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন।
আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থাও অনুসন্ধান চালিয়েছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহ বলেন, “আইসিএল-এর এমডি শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতসহ একাধিক মামলার সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের চাহিদার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।”
এদিকে শফিকুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ায় ভুক্তভোগী গ্রাহকরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা দ্রুত ও কার্যকর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ন্যায্য পাওনা ফেরত নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।